Tuesday, December 2, 2008

@ ছিদ্রান্বেষণ!...(রম্য-রচনা)















ছিদ্রান্বেষণ!...(রম্য-রচনা)
রণদীপম বসু

দিনে দিনে ছিদ্রান্বেষণকারী মানুষের সংখ্যা যেই হারে বাড়িয়া যাইতেছে তাহা যে অতিশয় দুঃশ্চিন্তার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে ইহা আমার দুঃশ্চিন্তার বিষয় নহে। দুঃশ্চিন্তা হইলো আমার আঁতেল বন্ধুটির। যে নাকি মুখ ভার করিয়া থাকিলেই বুঝিতে হয় যে গুরুতর কিছু ঘটিতে যাইতেছে। বলিলাম, কী হইয়াছে তোমার ? আমার মুখের দিকে কিয়ৎক্ষণ অন্যমনস্কভাবে তাকাইয়া থাকিয়া হঠাৎ যেই প্রশ্নটি করিয়া বসিল, তাহা শুনিয়া আমি ভ্যাবচেকা খাইয়া গেলাম ! ‘বলো তো , ছিদ্র মানে কী ?’ প্রশ্নের গুরুত্ব হেলাফেলা করিবার নয়। কেননা এই বন্ধুটির মধ্যে আমরা কস্মিনকালেও কোন তরল-স্বভাব জনিত পাতলা আচরণাদি প্রত্যক্ষ করি নাই। সেইহেতু উত্তরে বলিলাম বটে, ছিদ্র মানে তো ছিদ্রই ! কিন্তু বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না, বন্ধুটি হঠাৎ এইরকম ছিদ্রের অন্বেষণে ব্যস্ত হইয়া পড়িল কেন !

আমার উত্তরে আমি নিজেই সন্তুষ্ট নই, সে ইহাতে কীরূপে সন্তুষ্ট হইবে ! আমার অজ্ঞানতার গর্ত ভরাট করিতে বন্ধুপ্রবর নিজেই স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া বলিতে শুরু করিল- ব্যাকরণাভিধানে বাঙালা ভাষায় অতি অল্প শব্দই রহিয়াছে যাহাদের একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী একাধিক অর্থ থাকিতে পারে। ‘ছিদ্র’ শব্দটিও সেইরূপ একটি শব্দ, বাঙালা অভিধানে যাহার অর্থ দেওয়া হইয়াছে (১) ফুটো, ফুটা, বিবর, ছেঁদা, বিঁধ, রন্ধ্র। (২) দোষ, ত্রুটি। (৩) অবকাশ। সেই ক্ষেত্রে বাঙালায় 'ছিদ্রান্বেষণ' শব্দটি তিন ধরনের অর্থবিশিষ্ট হইবার কথা। ছিদ্র খুঁজিয়া বেড়ানো, দোষ খুঁজিয়া বেড়ানো, কিংবা অবকাশ খুঁজিয়া বেড়ানো। অথচ কী আশ্চর্য দেখো, অভিধানে ছিদ্রান্বেষী শব্দটির একটি মাত্র অর্থকেই অনুমোদন করা হইয়াছে- যে অপরের দোষ খুঁজিয়া বেড়ায় ! শব্দটি কি অন্যায়ভাবে কেবলি একটি দুরভিসন্ধিমূলক নেতিবাচক ভাবকেই ধারণ করিয়া থাকিবে ? ইহার অন্যথা হইবে না কেন ? আমি যদি তোমাকে বলি, ওহে, এই নাও, সুইটির ছিদ্রান্বেষণ করো, তুমি কি তাহলে উহার পশ্চাৎদেশের ছিদ্র অন্বেষণ না করিয়া দোষ খুঁজিয়া বেড়াইবে ? না কি ছিদ্রটাকেই দোষ ভাবিয়া উৎফুল্ল হইয়া উঠিবে ?

আমার দিকে সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি লইয়া তাকাইয়া থাকায় বুঝিলাম, আমার কাছেই উত্তর চাহিতেছে। বলিলাম, সুইয়ের পাছায় ছিদ্র থাকা দোষ হইবে কেন ? ছিদ্র না থাকিলেই বা ইহা সুই হইবে কী করিয়া ? বরং ছিদ্র না থাকাটাই তো ইহার দোষ হইবে !
তাহা হইলে আমরা কী বুঝিলাম ? পুনর্বার প্রশ্ন।
আমি কিছু বুঝিতে পারিলাম কিনা তাহাই বুঝিতে পারিলাম না। শুধু বলিলাম, হঠাৎ করিয়া তুমি ছিদ্রের পিছনে লাগিলে কেন ?
বলিল, ছিদ্রের পিছনে তো লাগি নাই ! লাগিয়াছি ছিদ্রান্বেষণের পিছনে।
মানে ?
জন্ম সংক্রান্ত জটিলতা। না, ভুল বলিলাম, জন্ম তারিখ সংক্রান্ত বিভ্রান্তির কথা বলিতেছি।
বুঝিলাম না, বন্ধুটি কিসের কথা বলিতেছে। বলিলাম, হঠাৎ জন্ম সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিল কেন তোমার ? এরূপ সন্দেহের হেতু ? আর এই ঘটনার সাথে ব্যাকরণ অভিধানের সম্পর্ক কোথায় ?
সে আশ্চর্য হইয়া বলিল, তুমি কি কোথাও সম্পর্ক দেখিতেছ না !
আমি কোন জবাব না দিয়া তাহার মুখের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলাম। সে বলিতে লাগিল-
সম্পর্ক তো আছেই। সুইয়ের পিছনে তুমি কি ছিদ্র খুঁজিবে, না কি দোষ খুঁজিবে, সেইটাই প্রশ্ন !
আমি তাহার কথার কোন আগামাথা বুঝিলাম না। বলিলাম, তোমার সমস্যাটা কোথায় বল তো ?
সে বলিল, সার্টিফিকেটের সহিত বাস্তবে জন্ম তারিখ না মিলিলে কি সমস্যা জটিল হইয়া যায় ?
আমি বলিলাম, দেখো, স্কুলের সার্টিফিকেটে জন্ম তারিখ যাহা লিপিবদ্ধ হইয়াছে তাহা সঠিক নাও হইতে পারে। আমাদের অনেকেরই তো এইরূপ আছে। যেই তারিখে জন্ম হইয়াছিল পরবর্তী জীবনের বাস্তব অবস্থা কী হইতে পারে বিবেচনা করিয়া বয়স কমাইয়া রেজিস্ট্রেশান করানো হইয়াছে। এইটা তো আকছার ঘটিতেছে। ইহা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারই নিদারুণ দূরাবস্থার চিত্র।
হাঁ, তোমার কথা মানিয়া নিলাম। এইবার বল তো দেখি, এই ক্ষেত্রে তুমি জন্মতারিখ কোনটি ব্যবহার করিবে ?
প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সার্টিফিকেটে যাহা আছে তাহাই। আর রাশিফল বিচার করিতে হইলে প্রকৃত তারিখই ব্যবহার করিব।
বাহ্‌, সুন্দর বলিয়াছ তো ! রাশিফলের বিষয়টি তো আমার মাথায় আসে নাই !
তোমার মাথায় কী আসিয়াছে তাহাই বলিয়া ফেল।
বিবাহের ক্ষেত্রে কোন্‌ তারিখটি তুমি ব্যবহার করিবে ?
ইহা কী বলিলে ! তুমিও যে বোকার মতো প্রশ্ন করিতে পার তাহা তো আগে কখনো ভাবি নাই !
এইবার ভাবিয়া বলো !
যদি বিবাহ রেজিস্ট্রি করিতে হয় তাহা হইলে সার্টিফিকেটের তারিখটাই বলিব। আর যদি মন্ত্র পড়িয়া যজ্ঞাদি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহকার্য সম্পন্ন করিতে হয়, তাহা হইলে তো প্রকৃত তারিখটাই বলিতে হইবে। তাহা না করিলে যে শাস্ত্রীয় অকল্যাণ হইবে ! বৈবাহিক সম্পর্কটাকে তো আর ছোট করিয়া দেখিবার উপায় নাই।
বিদেশ গমনের বেলায় ?
তুমি কি আবারও নির্বোধের মতো পাসপোর্টের কথা বলিতেছ ?
হাঁ।
আমার মনে হয় এইবার তোমার মানসিক চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন হইবে !
আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু তুমি দাও নাই।
মনে হইতেছে খুবই হতাশাজনক উপসর্গ। কিছুক্ষণ তার দিকে হা করিয়া তাকাইয়া তারপরে বলিলাম, সার্টিফিকেটের তারিখটাই দিব !
কিন্তু তাহার সাথে এইবার কথা বলিতেই আমার আর আগ্রহ হইতেছে না। আমাদের মধ্যকার মেধাবী বন্ধুটির হঠাৎ এ কী হইল ! তাহার জন্য খুবই দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হইয়া পড়িতেছি। নিশ্চয়ই তাহার কোথাও একটা গণ্ডগোল হইয়াছে। কেন জানি সতর্ক হইয়া উঠিলাম। পাগলাটে লোকজন হইতে দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয়। এদিকে তাহার পরের প্রশ্ন, তুমি কি জাতীয় পরিচয় পত্র করাইয়াছ ?
হাঁ করেছি।
উহাতে তারিখ কোনটা দিয়াছ ?
প্রশ্ন শুনিয়া এইবার আমি হতবাক হইয়া রহিলাম ! তাহার উত্তর দিতেই আমার রুচিতে বাঁধিল। অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া বলিলাম, তুমি কি আমাকে ছাগল পাইয়াছ !
কিন্তু এদিকে তাহার ভ্রুক্ষেপই নাই।
মনে করো তুমি নির্বাচনে প্রার্থী হইলে। নমিনেশন ফরমে কোন্‌ তারিখখানা উল্লেখ করিবে ?
এহেন উন্মাদের মতো প্রশ্ন শুনিয়া এইবার আর ধৈর্য্য সংবরণ করিয়া রাখাটাই দায় হইয়া পড়িল। তৎক্ষণাৎ বিনা বাক্য ব্যয়ে উঠিয়া দাঁড়াইলাম। উন্মাদ না হইলে এইরকম পাগলের প্রলাপ কাহারো মুখ দিয়া বাহির হইতে পারে ! অমনি হাঁটা ধরিলাম। কিন্তু তাহার আগেই আমার শার্টের কাছা টানিয়া ধরিল সে- আহা, ক্ষেপিয়া যাইতেছ কেন ! আর একটি মাত্র প্রশ্ন করিব। কেবল এই প্রশ্নটির উত্তর পাইলেই আমার চলিবে।
আমি তখন তাহার মুষ্ঠি হইতে নিজেকে ছাড়াইতে ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। কিন্তু কিছুতেই ছাড়াইতে পারিতেছি না। শুনিয়াছি পাগলের দেহ নাকি প্রচণ্ড শক্তি ধরিয়া থাকে। ততক্ষণে শরীর আমার কাঁপিতে লাগিল। বাহিরে প্রকাশ না করিলেও মনে মনে ভীত হইয়া উঠিলাম। উদ্ধার পাইবার উপায় খুঁজিতেছি। সেই মুহূর্তে তাহার সর্বশেষ প্রশ্নটি শুনিয়া আমার উত্থিত সমস্ত উপসর্গই আচমকা বদলাইয়া গেলো-
এই যে তুমি এতগুলি জায়গায় জন্ম তারিখ ব্যবহার করিয়াছ, প্রতিটি জায়গায় কি ভিন্ন ভিন্ন জন্ম তারিখ হইতে পারে না ?

বিলক্ষণ বুঝিতেছি, একটা দুরারোগ্য পাগলের শক্ত মুষ্ঠিতে আটকা পড়িয়া প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীন আমি একটু একটু করিয়া মূর্চ্ছা যাইবার পথে। বহু দূর হইতে সর্বশেষ যে বাক্যটি মৃদুস্বরে কানে আসিল- বুঝিয়াছি, তুমি অদ্যকার পত্রিকাখানা পড়িয়া দেখ নাই। বদ্ধ পাগলও আজ পাগলামীতে হারিয়া গিয়াছে... ! হা হা হা !
(০১-১২-২০০৮)

[sachalayatan]

No comments: