Showing posts with label Unknown-Words. Show all posts
Showing posts with label Unknown-Words. Show all posts

Sunday, August 2, 2009

# বন্ধুহীন একটি বিকেল...


বন্ধুহীন একটি বিকেল...
রণদীপম বসু

জীবন কি গড়িয়েই চলে ! গড়িয়ে গড়িয়ে কোথায় যে যায় ! এর কূলকিনারা আমরা যে পাই না, তা কি চিরায়ত জীবনটার আবহমান দূরত্ব পাড়ি দেয়ার বিপরীতে আমাদের নিজেদের জীবন-দৈর্ঘ্যরে অকল্পনীয় হ্রস্বতা ?

অনন্ত জীবনের কাছে প্রতিটা মানুষের এতো কৌতুকময় উপস্থিতি একদিন ঠিকই অনুপস্থিতির শূন্যতায় ঢেকে যায়, আমরা থেমে যাই। কিন্তু জীবন গড়িয়েই চলে, বিরামহীন।

যতক্ষণ আমরা আমাদের বহমান অস্তিত্ব আঁকড়ে থাকি, জীবনের সাথে কেউ বা দৌঁড়ে ছুটি, কেউ হেঁটে, আবার কেউ বা সত্যিকার অর্থে গড়িয়েই। জীবন যে থামবেই না, এটা জেনে যাই, যখন বুঝে যাই আমাদের অস্তিত্ব থেমে যাবে একদিন অকস্মাৎ কোন এক অদৃশ্য বিকেলে। যতই দৌঁড়াই না কেন, অথবা হেঁটে হেঁটে যতই পেছনে পড়ি কিংবা গড়িয়ে যাই, সবাই থেমে যাবো একদিন, এমন অপয়া ভাবনাগুলো একটু একটু করে স্মৃতিহীন হতে হতে ছুঁয়ে যায় জাতিশ্বর রেখাটিও। তবু কী জৌলুস নিয়ে হা হা করে হেসে ওঠি আমরা ! হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ি দৃশ্যমান কোনো গড়ানো-জীবন দেখেই ! করুণাও করে ফেলি হয়তো ! হয়তো ভুলে যাই তাও, করুণা আর সহানুভূতি কখনোই এক হয না।

জীবনের চিরময়তাকে বন্ধু বানায় যাঁরা, চিরকালের বন্ধুহীন তাঁরা। জীবনের হ্রস্বতাই বুঝতে পায় বন্ধুতার কষ্ট। কোন এক বন্ধুহীন অদৃশ্য বিকেলে তাই না পাওয়ার কষ্টতারা আড়মোড়া ভাঙে, অর্থহীন প্রলাপের রণন তোলে, বুকের গহীন থেকে কা’কে যেনো ডেকে ওঠে সায়াহ্ণের ভাষায়- ও বন্ধু আমার...!

চারদিকে একটাই স্পন্দন তখন, অদৃশ্য ঘুণপোকার মতো একটানা ডেকেই চলে- বন্ধু আমার, ও বন্ধু আমার...

[sachalayatan]

Wednesday, June 10, 2009

# বাবা আমাকে একটিবার দেখতে চেয়েছিলেন...


বাবা আমাকে একটিবার দেখতে চেয়েছিলেন...
রণদীপম বসু

০১.
শেষবার যখন বাড়ি থেকে আসি, বাবা আমার হাতটি ধরে বলেছিলেন- দেখ্ বাবা, তুই বাড়ির বড়, আমার বয়েস হয়ে গেছে, অসুস্থ, কখন কী হয়ে যায়, তুই সবাইকে দেখে রাখিস। ভারী চশমার পুরু আতশ কাচের মধ্যে দিয়ে পঁচাশি-উর্ধ্ব বাবার ভেসে থাকা ঘোলা চোখ দুটোর আকুতি বুকের ভেতর খুব করে বাজলেও তখনও কি বুঝেছিলাম বাবার সাথে এটাই আমার শেষ দেখা ? ডেবে যাওয়া চোঁয়াল আর ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকা তাঁর শরীর দেখে কে বলবে যে জীবন-বিলাসী এ মানুষটি এই সেদিনও ট্র্যাক-স্যুট আর ক্যাডস পরে টুপি মাথায় শহরময় দিব্যি প্রাতভ্রমন সেরে এসে ঘুম ভাঙাতেন বাড়ির সবার ! আজীবন দাপিয়ে বেড়ানো প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী যে মানুষটি শরীরে ঘাতক ক্যান্সার নিয়ে চুরাশি পেরিয়েও কাজকর্ম ছাড়া এক দণ্ড বসে থাকা কাকে বলে জানতেন না, সেই তিনিই কিনা এতো অসহায়ভাবে সংসারের কোনো কাজে না লাগা অথর্ব সন্তানটিকে সংসারের দায় বুঝিয়ে দেবার দুঃসহ কাজটি করে ফেললেন ! কোনো অব্যাখ্যাত কারণে তিনি কি সত্যিই বুঝে ফেলেছিলেন, এই অভাগা সন্তানটির সাথে আর কখনোই দেখা হবে না তাঁর ?

শেষবার যখন বাড়ি থেকে আসি, অনেকগুলো মাস পেরিয়ে গেছে, তখনো কি বার্ধক্যের ভারসাম্য রাখতে লাঠি ধরেছিলেন ? মনে পড়ে না। সম্ভবত কোন অবলম্বন আঁকড়ে ধরা বড়ই অপছন্দ ছিলো তাঁর। নিজস্ব পা দুটোর উপর আস্থায় এতোটাই অটল ছিলেন যে, দুর্বল শরীরটাকে কেউ ধরে ধরে কোথাও এগিয়ে দিতে চাইলেও নির্দ্বিধায় ফিরিয়ে দিতেন, রূঢ়ভাবে। এমনকি তৃতীয়বারের ভারী অপারেশনপূর্ব প্রচণ্ড স্নায়ুচাপে বাদবাকী সবাই যখন অনিশ্চিত আশঙ্কায়-অস্থিরতায় ন্যুব্জপ্রায়, এমন অদম্য মনোবল নিয়ে সবার অলক্ষ্যে কখন কীভাবে যে ক্যাথেটারটি হাতে ঝুলিয়ে গটগট হেঁটে ওটিতে ঢুকে গিয়েছিলেন, তা ভাবতে গেলে এখনো চেতনা স্থবিঢ় হয়ে আসে ! তিনিই আমার বাবা। অথচ পঁচাশির প্রকৃত বয়েসটাকে ঠিকই বাড়াতে বাড়াতে পঁচানব্বই পার করে দিতে একটুও দ্বিধা হয়নি তাঁর। তা কি বার্ধক্যের বিভ্রান্তি, না কি শতায়ু হবার কল্প-বিলাস কে জানে ! আশার নাম মৃগতৃষ্ণিকা। আমরা যে সত্যিই তা উপভোগ করতাম তিনি হয়তো তা বুঝতেন না। আর আমরাও বুঝিনি, ডাল-পাতা শুকিয়ে গেলেও প্রাচীন বৃক্ষের বাৎসল্যের ছায়া কতোটা আশ্রয় আর অভয় দিয়ে জড়িয়ে রাখে সর্বক্ষণ। আকস্মিক সময়-ঝড়ে উপড়ে যাওয়া বটবৃক্ষের শূন্যতা আজ গভীর প্রলাপ হয়ে বুকের ভেতরে শুধু খুঁড়ে খুঁড়ে যায়। আহ্ জানিনা, অযোগ্য সন্তান হিসেবে কতোকাল এই অদৃশ্য যন্ত্রণা বয়ে যেতে হবে আমাকে !

০২.
হাতঘড়ির গোল ডায়ালের ছোট্ট চৌকোণা ঘরটাতে ক্যালেণ্ডার ডেটটা ধবধবে সাদা। মে মাসের ২৪ সংখ্যাটি সরে গেছে কখন, ২৫ তখনো পৌঁছায়নি এসে। আসি আসি করছে। আচমকা মোবাইলটা বেজে ওঠলো। বাড়ি থেকে ছোট ভাইয়ের ফোন- সেজদা, বাবা কথা বলতে পারছেন না আর, আপনাকে দেখতে চাচ্ছেন ! ফোনটা কানে ধরিয়ে দিচ্ছি, কখন আসছেন বলে দেন জোরে।
দড়াম করে বুকের ভেতরে কী যেন বাড়ি খেলো এসে ! একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। গত তিনমাস ধরে পুরোপুরি শয্যাশায়ী বাবাকে দেখবো দেখবো করতে করতেও বাড়ি না গিয়ে যে অমোচ্য অপরাধে অপরাধী হয়ে আছি, তার ভার যে হঠাৎ সমস্ত অজুহাতের উর্ধ্বে উঠে এমন অবহ হয়ে ঝাপিয়ে পড়বে, এর প্রায়শ্চিত্ত কী দিয়ে করবো আমি ! সবাইকে অবাক করে দিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বাবার কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিলাম- তুই আয় তুই আয়। আকস্মিক আর্তনাদে কেবল বলতে পারলাম- বাবা, আমি আসছি, কালই।

দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে ২৫ মে’র যে সকালটা এলো আমার জীবনে, তখনো তো বুঝতে পারি নি যে ১১ জৈষ্ঠ্যের নজরুল জয়ন্তির এই দিনটিই আমার চিরকালের কালো পর্দায় ঢেকে যাবে এভাবে ! সকালে অফিসে পৌঁছেই পরের দিন থেকে ছুটি মঞ্জুর করিয়ে ব্যাংকে ছুটলাম বেতনের টাকা তুলতে। সব প্রস্তুতি সেরে দুপুরেই আগেভাগে বেরোতে যাবো, সেই সর্বনেশে ফোটটি এলো দুটোয়, কনিষ্ঠ ভাইটির নম্বর থেকে। হ্যালো হ্যালো করছি, কোনো জবাব নেই। পৃথিবী জুড়ে শুধু তীব্র বিলাপের স্বর ! মোবাইল ফোনের অদৃশ্য সুড়ঙ্গ বেয়ে বুকভাঙা আর্তনাদে সবকিছু এলোমেলো তখন... !

০৩.
ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র সাত নম্বর বিপদ সংকেত মাথায় নিয়ে চেয়ারকোচ ‘শ্যামলী’ হু হু বাতাস কেটে ছুটে চলেছে সিলেটের দিকে। বুকের চরায় হিমবাহী পাথরটা অসম্ভব জড়তায় স্থির হয়ে আছে। আর এদিকে একটার পর একটা ম্যাসেজ আর রিংটোনে অস্থির হয়ে ওঠছে মোবাইলটা আমার। আশ্চর্য ! অনিচ্ছুক ভ্রান্তিগোলে কাউকেই জানানো হয়নি কিছুই। অথচ দেখা না দেখা, সচল অসচল, বন্ধু সহকর্মী সহযোদ্ধা আর পরিচিতজনের একের পর এক শোক, সাহস আর সান্ত্বনার বাণী অদ্ভুত সহমর্মিতায় কীভাবে যেন ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আমাকে ! নুরুজ্জামান মানিক, ইশতিয়াক আহমেদ, প্রভাস দাস, মজিবুর রহমান, নজরুল ইসলাম, ইলতুৎ আলীদ, আহমেদুর রশীদ টুটুল, খালেদুর রহমান জুয়েল, অতন্দ্র প্রহরী, জগলুল হায়দার, গৌতম... আরো কতো কতো মুখ ! ইতোমধ্যেই নাকি নুরুজ্জামান মানিক ভাই সচলায়তনে শোক জানিয়ে অন্তর্জালিক পোস্ট ছেড়ে দিয়েছেন ! ওদিকে আরেকটা পোস্ট ইশতিয়াকের, সামহোয়ারইন-এ ! পৃথিবী জুড়া অসংখ্য ঋণের ভারে আবদ্ধ আমি জানি, বন্ধুত্বের যে অকৃত্রিম উষ্ণতায় পিতৃশোকের দুর্বহ ব্যথা গলিয়ে আমাকে চিরকৃতজ্ঞতায় ভাসিয়ে দিলো এরা, এ ঋণ আর শোধ হবার ! কখনোই শোধ হবার নয় ! অসম্ভব সে চেষ্টা কখনো করবোও না আমি।

প্রবল বৃষ্টি-ঝড়ের মুহুর্মুহু তাণ্ডবে ভেঙে পড়ছে প্রকৃতি। যেন সবকিছু একাকার হয়ে যাবে আজ ! আদৌ কি পৌঁছুতে পারবো ! ছোট ভাইয়ের ফোন আবার- সেজদা, কতোক্ষণ লাগবে আসতে ? আহা ! মানুষের জীবনটা কি সত্যিই এতোটাই ট্র্যাজিক ? নইলে ভাইয়ের এই প্রশ্নটা কেনই বা পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন আর ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিলো আমার কাছে ? এর উত্তর সত্যিই জানা ছিলো না আমার। কতোক্ষণ লাগবে, কতোক্ষণ লাগবে... মাথার ভেতরে হাতুরির আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছি শুধু... ! আশৈশব কত স্মৃতি কত স্বপ্ন কত কথা কত অভিমান আর অস্তিত্বের অপরিহার্যতায় মাখানো বাবার হাতটি ধরে জীবনের পয়তাল্লিশটি বছর নিমেষেই কেটে গেলো ! অথচ ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ, উপকূল ছেড়ে এসে আছড়ে পড়া ‘আইলা’র তীব্র ছোবলে সময়-ঘড়ির মাত্র আট ঘণ্টার রাস্তা এক জীবনে আর ফুরালো না আমার... ! সবকিছু ছেড়েছুড়ে এভাবেই চলে গেলেন বাবা। আমার জন্যে একটুকু অপেক্ষাও করতে পারলেন না ! পিতা হয়ে অধম এ সন্তানের সাথে এতোটা অভিমান করতে পারলেন তিনি ! আমারো তো অভিমান থাকতে পারে ! এই দুঃসহ অভিমান আমি কাকে দেখাবো আজ !!!

০৪.
বাবা আমাকে একটিবার দেখতে চেয়েছিলেন ! চিতার আগুনে পোড়া দেহভস্মও ধোয়ে গেছে তখন। ছাব্বিশ তারিখের রঙহীন বিমর্ষ এক ভাঙাচূরা সকাল বিষাদ-মর্মর সিঁড়িটার গোড়ায় এসে থেমে গেলো শেষে। আদরের ছোট্ট বোনটি আর্তচিৎকারে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো বুকে- সেজদাগো...বাবা তো আপনাকে না দেখে যেতে চান নি...শুধু এদিক-ওদিন খুঁজেছেন আপনাকে... কেন এতো দেরি করে ফেললেন...কেন... !

বারান্দায় সেই চেয়ারটি আর নেই। জায়গাটা আজ বীভৎস ফাঁকা ! পট্টবস্ত্র গায়ে উস্কুখুস্কু দাঁড়িয়ে থাকা ভাইটির পাথর-চোখে এ কোন্ অবোধ্য আগুন্তুক অক্ষরগুলো ঝুলে আছে এলোমেলো, নির্মম ! বড় বেশি অচেনা এসব ! একে তো আর কখনোই অনুবাদ করা হবে না আমার ! যার কোনো অনুবাদ হয় না... কিছুতেই... কখনোই...।

[sachalayatan]
[somewherein]

Friday, May 15, 2009

# ছেঁড়া ঘুড্ডি। ০৩। শেষ মুহূর্তের আগে...


শেষ মুহূর্তের আগে...
রণদীপম বসু

০১.
বুকের ভেতরে কোথায় যেন একটা পাথর আটকে গেছে ! শ্বাস নিতে পারছি না। ভয়ঙ্কর হাসফাস হচ্ছে। আগুনের তীব্র হল্কায় ভেতরে ঝলসে যাচ্ছে সব। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। খাড়া করা দড়ির মতো ভারসাম্যহারা শরীরটা মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। এরপর যা ঘটতে লাগলো, অবিশ্বাস্য, আরো ভয়ঙ্কর ! চোখ দুটো বুজে এসেছে প্রায়। কিন্তু এ কী দেখছি আমি ! এক তীব্র অজানা আতঙ্কে সিটিয়ে যাচ্ছি ক্রমশই। ব্যায়ামপুষ্ট তরতাজা শরীরটা শুকনো ফোটা পাকা আমের বাকলের মতো এমন অদ্ভুত কুঁকড়ে যেতে লাগলো, খলবলে পেশীবান ভেজা উরুটা দেখতে দেখতেই চিপসে অর্ধেক হয়ে গেলো ! ধনুকের ছিলার মতো তারুণ্যের উজ্জ্বল টানটান চামড়া যেন সহস্রভাঁজে ঝুলে পড়েছে। কে বলবে এটা বিরানব্বই বছরের পুষ্টিহীন কোন অশীতিপর বার্ধক্য আক্রান্ত উরু নয় ! মাংসপেশীগুলো জমে পাথর হয়ে যাচ্ছে সব। গোটা শরীরটাই কি এমন বীভৎস হয়ে গেলো !

একটা বিকৃত কদাকার পাথর-শরীর চৈতের কাঠফাটা আগুনে পোড়া মাঠের মধ্যে অসহায় তড়পাচ্ছে কেবল। প্রচণ্ড বিশ্বাসী এই শরীরের অস্বাভাবিক রূপান্তরে হতবাক আমি আকুল হয়ে ওঠার সময় পেলাম কিনা জানি না, তার আগেই সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো। মাঠভর্তি হৈ-হল্লা চিৎকার চেচামেচি গুঞ্জন সব মন্থর থেকে মন্থর হয়ে আসছে। এবং আশ্চর্য ! হঠাৎ করে তীব্রতম সব অস্বস্তি, কষ্ট, ভোগান্তি, যন্ত্রণা স-ব একে একে বেমালুম মুছে যাচ্ছে ! আহ্ কী শান্তি ! অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। এক বিশাল শূন্যতা বুঝি ধেয়ে আসছে আমার দিকে। বুঝলাম, সময় নেই। তবে কি মারা যাচ্ছি আমি ! আহা, কারো কাছে ক্ষমাটুকু চেয়ে নেয়ার ফুরসতটাও পেলাম না ! ভীষণ আফসোস হলো, হায়, কেন যে এমন হঠকারি কাজটা করতে গেলাম ! প্লীজ, আমাকে মাফ করে দিয়ো, বন্ধুরা...সবাই...

০২.
...গভীর এক নৈঃশব্দের মধ্যে কতোকাল ধরে শরীরটা দুলছে ! গাড়িতে চড়লে কি এমন হয় ! পৃথিবীর অন্ধকার অতল কোন গহ্বর থেকে অসম্ভব মৃদু কিছু গুঞ্জন, ভাসছে... বাড়ছে..!

০৩.
ছেলেটা ঠিক মা’র চেহারা পেয়েছে ! দেখলেই ওর মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে।
ঠিকই।
তবে হ্যাঁ, এই ছেলেরা কিন্তু ভাগ্যবান হয় !
হাহ্ ! ভাগ্যবান ! ........
.....................
যাহ্, তোর সাথে আর খেলমু না !
কেন, খেলবি না কেন ?
তুই খালি চুরি করস ! দে আমার মারবেলগুলা দে !
কিসের মারবেল তোর ! এইগুলা সব আমার। যা ভাগ্ !
দেখ্, ভালো হইবো না কইলাম !
ইহ্, ভালো হইবো না মানে ! কী ভালো হইবো না !...
ও মাগো... আমারে মাইরা ফালাইলো গো.......
...............................
এই আমারে একটা হাওয়াই মিঠাই দে।
দশ পইসা কিন্তু !
ইশ্, দশ পইসা ! পাঁচ পয়সা দিমু, দে !
না...!
আইচ্ছা ঠিক আছে যাহ্, দশ পয়সাই। দে একটা দে। পয়সা কাইল ইস্কুলে আইয়া নিস্।
না, আম্মায় বাকি দিতে মানা করছে ! বাকি দিমু না আমি।
কী ! দিবি না ! দাঁড়া দেখাইতাছি......!
আ..আ..আ..., আমার বাক্স গেলাস ভাইঙ্গা ফালাইছে...আ..আ..আ.......
................................
গর্দভের দল ! ইস্কুলটা কি ফাজলামী করার জায়গা ! বেয়াদ্দপ কোথাকার ! এই, এদিকে আয় ! পড়া আনিস নি কেন ? কানে ধইরা এইখানে পঞ্চাশবার উঠবস কর ! এই তুইও এদিকে আয়। দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া তুই গুনতে থাকবি...। ... আচ্ছা গতকাল আমরা কত পৃষ্ঠায় শেষ করছিলাম ?...
ফটিকরে তার মামায় আইসা লইয়া গেছে...
এক..দুই..তিন......নয়..দশ......পনের..ষোল......একত্রিশ..বত্রিশ......পঁচিশ..ছাব্বিশ...
দেখ্, ভালা হইবো না কইলাম !
রবীন্দ্রনাথ এখানে বলতে চেয়েছেন যে...
...উনত্রিশ..ত্রিশ......বাইশ..তেইশ...
ওই, ফাইজলামি করস ! চল্লিশরে বাইশ গনতাছস ! কেলাশ শেষে শালা তোর নাকের বদনাটা ফাটাইছি আইজ !...
এই বয়েসটার মতো এমন বালাই আর নেই কেন ? ...এই হইছে তোদের !
জ্বী.. তিরিশবার হইছে স্যার !
না স্যার ! এই হালার পুতে মিছা কইতেছে ! আমার পঞ্চাশবার পুরা হইছে...
চুপ ! কত্তোবড়ো বেয়াদপ ! এই যা তো, অফিসরুম থাইকা লম্বা বেতটা নিয়া আয়..!......
................................
ইশশিরে ! এইমাত্র না তারে গাছে দেখলাম ! ওই আগায় বইসা কী জানি খাইতেছিল। হঠাৎ এমোন পাকনা তালের মতো...
আরে ভাই আগে তোলা দিয়া পুকুরে নেন...
আরে আরে কথা কইতে পারতেছে না তো ! এই ধর ধর...
না না এইভাবে না ! পানিতে বুকটারে চুবাইয়া বসান তাড়াতাড়ি...গোঙানি বাইর হইলে হাসপাতালে নিয়া ......
................................
এই ছেলে ! বেয়াক্কেলের মতো স্টেজে এতো পা কাঁপাচ্ছিলে কেন এ্যাঁ ? আর কী আশ্চর্য ! একই ডায়লগ বারবার বলছিলি কেন শুনি !
জ্বী স্যার, মানে.....
................................!
তোরা যে আইজকাইল কী হইছস না ! থাকিস হুস্টেলে ! মাস-দু’মাসেও কি বাড়িতে একটা চিঠি লেখা যায় না ! পোস্ট অফিস থাইকা একটা পোস্টকার্ড নিয়া কিচ্ছু তো লেখাও লাগে না ! ভালো আছি এই কথাটা লেইখাই ছাইড়া দিলে হয় !
ঠিক আছে, দিমু।
প্রতিবারই তো ঠিক আছে বইলা যাস্ ! বুঝবি কেমনে ! যেদিন বাবা হইবি, সেদিন বুঝবি বাবারা কেন এইরকম কথা কয় !......
................................
কী ব্যাপার, কাঁদছো কেনো ?
কই, কাঁদছি না তো ! ইউনিভার্সিটিতে কতো সুন্দর সুন্দর মেয়ে আছে ! সেইখানে গিয়া কি আমারে আর মনে থাকবো তোমার !
দূর পাগলি ! এই বুকটারে যেইভাবে জুইড়া রাখছো তুমি, তোমারে না দেইখা আদৌ কি হলে থাকতে পারমু ! শেষপর্যন্ত লেখাপড়া শিকায় তুইল্যা ম্ক্তুকচ্ছ হইয়া তোমার এই দিওয়ানা মজনু রাস্তায় রাস্তায় লাইলী কই লাইলী কই কইয়া দৌঁড়তে থাকে কিনা কে জানে !
যাও, তুমি কী যে কও না !
তাইলে এবার কও, চিঠি পাবো তো ? সেইরকম...মাখানো ?
দ্যাখো ......
................................
গ্ল্যাড টু মিট য়্যু ! আমি... ম্যান অব কুমিল্লা, আপনি ?... আমি সিলেট। ......দোস্ত, বাগান থেকে অরিজিনাল চা-পাতা চাই। ...... আপনাকে না খুব জলি মনে হয়!....লজ্জা পাইলাম....আপনার মতো মেয়ের কাছে এলে পাথরও ফুল ফোটাতে শুরু করে যে !.......কী যে বলেন, আপনারা জুয়েল স্টুডেন্ট, তার উপরে...... এই দোস্ত, তুমি তো ব্যায়ামবীর মানুষ, নাম দিবা নাকি কম্পিটিশনে ?......কী ব্যাপার কবিতার কুস্তি হবে নাকি !...... আরে নাহ্.এথলেটিকস।......
... হাই দোস্ত, ফার্স্ট হওয়া চাই কিন্তু ! শাটল ট্রেন ভইরা ডিসি হিল যামু।.. প্রমিজ, তেয়ারি ফ্রি !...লিসেন টু মি...প্রথম চক্করে কেউ ট্র্যাক চেঞ্জ করতে পারবে না......বাঁ দিক দিয়ে ওভারটেক করলে ডিসকোয়ালিফাইড !......সাড়ে বারো চক্করে পাঁচ হাজার মিটার হবে...ঠিক আছে ?... প্রথম বাঁশি এলার্ট, দ্বিতীয় বাঁশি গো !
...... সাব্বাশ দোস্ত, আরো জোরে !......আগ বাড়ো দোস্ত আগ বাড়ো, সুবর্ণার কসম কইলাম !...... ইশ্, কী রোদ !...... দোস্ত, এই নাও, দাঁতে চাইপ্যা রাখো !...... এই এই পানি মার, পানি মার !...... আর মাত্র তিন চক্কর...... সাইড দিবা না দোস্ত ! কোনোমতেই......জোরসে জোরসে ! আর একটু বাকি !......আইসা গেছো দোস্ত, আইসা গেছো.....হ হ... হুররে......সেকেন্ড সেকেন্ড !......না না থার্ড হইছে...... আরে আরে কী হইছে দেখ্ তো !...... এই ধর ধর !...... অ্যাম্বুলেন্স লাগবো, অ্যাম্বুলেন্স !...... আরে ! এ তো শক্ত হইয়া গেছে !...... ম্যাসেজ ম্যাসেজ...... ইমার্জেন্সী ! ইমার্জেন্সী !......
প্রেশার ? ...স্যার আর্জেন্ট স্যালাইন পুশ করে দেই ?... না ! সাথে সাথেই প্যাসেন্ট এক্সপায়ার করবে !...কিছুতেই স্যালাইন পুশ করা যাবে না ! ... সিভিয়ার সান-স্ট্রোক !... র‌্যাপিড স্যালাইন মেসেজ, অল ওভার দ্য বডি, কুইক ! ......এই, ভিসিকে ফোন করো ! এদেরকে মার্ডার কেসে দেয়া উচিৎ !... থার্টি এইট ডিগ্রী সেলসিয়াসে এই আহাম্মক ছেলেপেলেগুলারে মারতে নামাইছে !... জানাইয়া দাও, থার্ড টাইম কোন প্যাসেন্ট রিসিভ করবো না আমি... সোজা চিটাগাং রেফার করবো !...ওয়ার্থলেস এইসব খুনের দায় আমি কেন নেবো ! রাবিশ ! ......

০৪.
পৃথিবীটা খুব দ্রুত কোলাহলময় হয়ে ওঠতে লাগলো। আশে পাশে ঠুংঠাং, ধুপধাপ, ক্যাচকোচ কতো রকমের শব্দ-স্রোত। কথাবলার আওয়াজও পাচ্ছি। দুই ঠোঁটের ফাঁকে কাপড় বা তুলা জাতিয় কিছু গুঁজে দেয়া হয়তো। হালকা নোনা স্বাদ আঠালো মুখটাতে ছড়িয়ে আছে। মুখে কি মাক্স লাগানো ? পায়ের আঙুল থেকে হাঁটু উরু কোমর পেট বুক হাত বা পিঠের ধারে কিরকম ঘষাঘষি টের পাচ্ছি যেন। চোখ খুলে সাথে সাথে বন্ধ করে নিলাম। অসহ্য ঝাঁঝালো আলো ! আবার খুললাম, এবারে চোখে সয়ে এসেছে। উৎকণ্ঠিত সহপাঠি বন্ধুদের মুখ। চিৎ হয়ে শোয়া আমাকে সমানে ম্যাসেজ করে যাচ্ছে ওরা। হঠাৎ চোখ খুলতে দেখেই হয়তো উজ্জ্বল হয়ে ওঠলো তাদের মুখ। মানে এবারের মতো বেঁচে গেলাম আমি ! আশপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারছি এটা ইউনিভার্সিটি হেলথ ক্লিনিক, যেখান থেকে আমরা হলের ছাত্ররা প্রায়ই ফালতু রোগ সাজিয়ে বিনে পয়সার ঔষধ নিয়ে যাই।

সংজ্ঞাহীন হবার আগমুহূর্তটা মনে পড়ে গেলো। শিরশির করে সেই আতঙ্কটাই চেপে বসছে আবার ! চোখ খুলতেই ভয় হচ্ছে এবার। কী না কী দেখবো ! না না, এমন বীভৎস শরীর চেহারা নিয়ে বেঁচে থাকার অভিশাপ কী করে বইবো আমি ! এর চেয়ে তো মৃত্যুই ভালো ! নিজের বালসুলভ হঠকারিতা, গোয়ার্তুমি, হতাশা, দুঃখে বুকটা ভেঙে হা হা করে কান্না আসছে। কুড়ি বছরের তরতাজা বয়সে থুত্থুরে কোঁচকানো অশীতিপর পরিত্যক্ত একটা দেহ নিয়ে কার কাছে যাবো আমি ! নিজের গড়া এই দুঃসহ নিয়তিই কি শেষপর্যন্ত সঙ্গি হলো আমার ! নাহ্, এর একটা সুরাহা তো আমার নিজেকেই করতে হবে ! নিয়তির মুখোমুখি হতে এবার মরিয়া হয়েই চোখ খুললাম, তাকালাম পায়ের দিকে। ওমা এ কী ! এ তো আমার সেই আগের পা ! আগের শরীরই ! ক্ষাণিকটা মলিন তবু আহ্, কী সুন্দর ! হুড়মুড় করে উঠে বসলাম। রে রে করে ওঠলো সবাই- আস্তে, আস্তে ! কিন্তু কে শোনে কার কথা ! অসম্ভব সুন্দর একটা পৃথিবীতে তখন অবস্থান করছি আমি !

পরনে সেই শর্টস, যেটা পড়ে পাঁচ হাজার মিটার দৌঁড়ের আন্ত-হল কম্পিটিশনে নেমেছিলাম। কিনিক ইন-চার্জ ডাক্তারের সামনে যেতেই নিগ্রোমার্কা বিশাল শরীরটার উপরে ঘাড় ধরে বসানো ছোট্টখাট্ট মাথাটা একটু উপর দিকে তুলে পিটপিট করে তাকালেন। খসখস করে একটা প্যাডে কী যেন লিখে বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে- সোজা হলে গিয়ে শাওয়ারের তলে মিনিমাম আধা ঘণ্টা !
মাথা চুলকে বললাম, কিন্তু স্যার, আমি যে দশ হাজার মিটারেও নাম দিয়েছি !
হোয়াট ! ফাজলামী করছো ! দুর্বাসার দৃষ্টিতে কটমট করে বিদ্রূপ মাখানো হুঙ্কার - তখন আর এতো কষ্ট করে এখান পর্যন্ত আসতে হবে না ! ... গেট লস্ট !
টুপ করে বেরিয়ে পড়লাম আমি। তাঁর বাজখাই গলা তখনো কিনিক জুড়ে গমগম করছে।

অ্যাম্বুলেন্স থেকেই উচ্ছ্বাসে-উৎসবে আন্দোলিত মাঠটা দেখা যাচ্ছে। রেজিস্টার বিল্ডিং-এর টিলাটার ঢাল বেয়ে চলে যাওয়া বৃত্তাকার সরু পাকা রাস্তাটার পাশেই বেশ নিচে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠটা। মাঠের এক কোণায় কিনিকের সামনে থেকে শ্যামলে সবুজে পাহাড়ে টিলায় ঘেরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার নয়নাভিরাম দৃশ্য যেটুকু চোখে পড়ছে, তা-ই আরো বেশি মনোরম হয়ে ওঠেছে আমার চোখে। অ্যাম্বুলেন্সটা বাঁক ঘুরতেই মাঠটা হারিয়ে গেলো। তবু মাইকের ছড়ানো আওয়াজে কোলাহলটা ঠিকই শোনা যাচ্ছে। পাশ থেকে বন্ধুটি এবার মুখ খুললো- বিশ্বাস করবি কিনা দোস্ত, যে মুহূর্তে মনে হচ্ছিল আমার প্রিয় বন্ধুটি আমার কোলেই মারা যাচ্ছে, কয়েক মুহূর্ত আমারও মনে হয় জ্ঞান ছিলো না।
বন্ধুভাগ্যে অহঙ্কারী আমি তাঁর চোখে চোখ রেখে বললাম, আমাকে মাঠ থেকে ক্লিনিকে নিয়ে আসতে কতক্ষণ লেগেছে বল তো ?
বেশি না, এই দেড় কি দু’মিনিট !
না দোস্ত, আমার তা মনে হয় না। তোরা আমাকে বিশ বছর বয়ে এনেছিস !
মানে ! সন্দিগ্ধ কণ্ঠ তাঁর।
মানে বিশ বছর ! আচ্ছা বল তো, মৃত্যুর আগ-মুহূর্তে মানুষ কি তার ফেলে আসা গোটা জীবনটাকে এক পলকে দেখে ফেলতে পারে ?
একথা কেন বলছিস ?
সত্যিই সংজ্ঞাহীন ছিলাম কিনা জানি না। তবে ওই সময়ে এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে গেছে ! জীবন্ত চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে আমি আমার জীবনের গোটা সময়টা, এমনকি প্রতিটা মুহূর্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে এক দীর্ঘ ভ্রমণ সেরে এসেছি ! একেবারে সেই শৈশব থেকে...
কী বলছিস ! তা কী করে সম্ভব ! এক আশ্চর্য বিহ্বলতায় আমার কথার মাঝখানেই তাঁর বিস্ময় ঝরে পড়লো।
আদৌ তা সম্ভব কিনা, সে প্রশ্নটা এখন শুধুই অবান্তর আমার কাছে। তবু পৃথিবীতে প্রশ্নরা বুঝি অন্তহীনভাবে বইতে থাকে। যার কোন উত্তরই জানা নেই আমার। ভেতরের গুনগুন করা স্বগতোক্তিগুলো অবাধ্য এ জিহ্বাটায় নাড়াচাড়া খেয়ে ছলকে ওঠছে কেবল-
জানি না দোস্ত। খুব ছোট্ট এই জীবনে কতো মানুষকেই যে কষ্ট দিয়ে এসেছি আমি ! সেসব তো ভুলেই গিয়েছিলাম !...
অবারিত বিস্ময় নিয়ে বন্ধুটি আমার মুখের দিকে চেয়েই রইলো। সোহরাওয়ার্দী হলের গেটে এসে অ্যাম্বুলেন্সটা ব্রেক করলো ঠিকই। কিন্তু সেই বিস্ময়টা অদ্ভুত এক আচ্ছন্নতা নিয়ে আমার মাথার ভেতরে ঘুরঘুর করতে থাকলো...
Image: from internet.
(০৭/০৫/২০০৯)

Monday, January 19, 2009

# ছেঁড়া ঘুড্ডি। ০২। দাগ


দাগ
রণদীপম বসু

রুমে ঢোকার মুখেই প্রথম বাধা, ব্যাগ আর জুতা রেখে যান। নির্দেশসুলভ কণ্ঠে ভদ্রতার ছোঁয়াটুকুও নেই। পোর্টফোলিও ব্যাগটা দরজার পাশেই নামিয়ে রাখলাম। জুতা-মোজা খুলে রেখে ভেতরে ঢুকতেই সামরিক পোশাক পরা দ্বিতীয় লোকটার ইঙ্গিত আমার মাথার দিকে। পূর্ণমুণ্ডিত বিরলকেশ মাথাটা উন্মুক্ত করে চারধার উঁচু করা গোলাকার সাদা ক্রিকেটিয় ক্যাপটা নামিয়ে পাশের টেবিলে রাখতে যাচ্ছি, আরেকজন সামরিক কায়দার লোক এসে ক্যাপটা নিয়ে গেলো। ভেতরের আরেকটি রুমে ঢোকার দরজার পাশে মেঝেতে ফেলে রাখলো।
ওটা কী ? দ্বিতীয় ব্যক্তিটির প্রশ্নে ফের মনোযোগ ফিরে এলো এদিকে। সন্দেহজনক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার ব্রম্মতালুর দিকে। কম করেও প্রায় ছ’ফিট উঁচু অবস্থান থেকে পাঁচ ফিট সাত ইঞ্চি আমার তালুতে সদ্য জোড়া-তালি সেলাইয়ের আড়াআড়ি দাগটা তাঁর চোখে পড়তে কোনো সমস্যা হয় নি। আমি মৃদু স্বরে উত্তর করলাম- দাগ।
কিসের দাগ ?
সেলাই।
এবার বুঝি তাঁর কমান্ডিং স্বরটা গাঢ় হয়ে উঠলো- কি হয়েছিল ?
ভরা কলসির কানা ডেবে গিয়েছিল।
আমার উত্তরে সন্তুষ্ট হলো কি হলো না বুঝা গেল না। উজ্জ্বল চোখ দুটো আমার চোখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাক করে রেখে প্রায় থ্রি কোয়ার্টার হাত দৈর্ঘ্যরে অদ্ভুত লাঠি জাতীয় জিনিসটার অগ্রভাগ দিয়ে দেয়ালের দিকে ইঙ্গিত করলো। নির্দেশমতো উল্লম্ব স্কেলটা ঘেষে দাঁড়ালাম। একজন হাঁক দিলো, সিক্সটি সিক্স।
এবার বিপরীত দিকের দেয়ালে ঝুলানো একটা বড় পর্দার দিকে তাকানোর নির্দেশ। ওখানে একজন দাঁড়ানো। পর্দায় অংকিত সারি সারি বিভিন্ন আকৃতির ইংরেজি আলফাবেটস। একটা স্টিকের মাথা এলোপাথারি বিভিন্ন বর্ণের উপর রাখছে আর প্রশ্ন ভেসে আসছে, এটা কী ? এটা ? ওটা ? আমিও দ্রুত উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। এরই মধ্যে আমার পাশে দাঁড়ানো লোকটা প্রথমে আমার বাঁ চোখ, তারপর ডান চোখ চেপে ধরছে আর একইভাবে ওদিক থেকে প্রশ্ন।
এবার দ্বিতীয় লোকটি আমার কাছে এসে ছোট্ট লাঠিটা থুতনির নীচের দিকে ছুঁইয়ে উপরের দিকে চাপ দিতে দিতে বললো- হা করুন।
আমি আলতো হা করলাম।
আরো বড় করে...।
আমি তাই করলাম। বাঁ হাতে ধরা ছোট্ট টর্চটা আমার মুখের ভেতর আলো ফেললো। তৃতীয় সামরিক ব্যক্তিটির হাতে অদ্ভুত লাঠিটা ধরিয়ে দিয়ে তার বাড়িয়ে দেয়া চামচের মতো যন্ত্রটা নিয়ে সোজা আমার মুখের ভিতর হলকম অবধি ঢুকিয়ে দিলো। এবং জিহ্বার উপর নীচ ডানে বামে কতক্ষণ নাড়াচাড়া করে চামচটা বের করে নিয়ে পেছনের চেয়ারটাতে বসার ইঙ্গিত করেই বললো- শার্ট খুলুন।
আমি শার্ট খুললাম, ভেতরের গেঞ্জিও খোলতে হলো। উদোম গায়ে চেয়ারটাতে বসতেই আবার কমান্ড- এভাবে থাকুন।
ঘাড়টা একপাশে কাত করে রাখলাম আমি। প্রথমে ডান কান, পরে বাম কানেও কী সব পরীক্ষা নিরীক্ষা চললো। এদিকে আরেকজন আবার ডান হাতে প্রেসার মাপার যন্ত্র জাতীয় কিছু ফিট করে নিয়েছে। চোখ দুটোকে নিয়ে হামলে পড়লো আরেকজন। তারপরে নাকটাকে। মাথাটা প্রায় চিৎ করে নিয়ে নাকের ছিদ্র দিয়ে কী একটা ঢুকিয়ে দিলো। টর্চ ফেলে দেখলোও আরো কী কী যেনো। সবকিছুই খুব দ্রুত ঘটতে লাগলো।

অল্পক্ষণ পরেই ভেতরের দরজার দিকে ইঙ্গিত, অর্থাৎ পরের রুমে। নিরবে কমান্ড পালন করছি। দরজার পাশে আমার টুপিটাকে আড়াল করে শার্ট আর গেঞ্জিটা পড়ে আছে মেঝেতেই। পাশের রুমে ঢুকার আগেই কমান্ড, প্যান্ট খুলে যান।
জী..? কমান্ডটা সঠিক শুনলাম কিনা নিশ্চিৎ হতে পারলাম না। পাশের সামরিক লোকটির দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালাম। একই কথার পুনরাবৃত্তি হলো- পরনের প্যান্ট এখানে খুলে রেখে যান।
বলে কী ! বেল্ট খুলতে খুলতে খানিকটা ইতস্ততঃ করছি। পাশ থেকে ধমক এলো, কুইক !
ধা করে খশে পড়লো প্যান্টটা। এবার শুধু ছোট্ট একটা বস্ত্রই শরীরে সেঁটে আছে, আন্ডার-অয়্যার !
ভেতরে ঢুকে সামরিক ইউনিফর্ম পরা লোকটির চোখের দিকে তাকাতেই রক্ত হিম হয়ে গেলো ! স্পষ্ট ইঙ্গিত আমার সবেধন নীলমণি ছোট্ট আন্ডার-অয়্যারটার দিকেই, রিমোভ !!

১৯৮১ সাল। সবে এইচ এস সি পাশ করেছি। ব্যায়ামপুষ্ট শরীরে মনে সব কিছুতে একটা ফুরফুরে ডোন্ট কেয়ার ভাব। নিজের সাধারণ ক্ষমতাটুকুকেও বাড়ন্ত তরুণীদের সামনে অতি-বীরত্বে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রকাশ করার মোহে উঠতি বয়সের উদ্দামতা তখন হার না মানায় উচ্ছল। নতুন পত্তনি করা বাসার সামনে বৃষ্টি-ভেজা শেষ বিকেলের পিচ্ছিল কর্দমাক্ত রাস্তায় সে রকমই এক অতি বীরত্ব দেখাতে গিয়ে মাথার তালু বরাবর দু’ফাঁক হয়ে যাওয়াটা তখনও টের পাইনি। টের পেলাম, যখন বৃষ্টিতে চুপসে যাওয়া গায়ের লাল গেঞ্জিটা দেখে বোঝার আর উপায় রইলো না যে অরিজিনালি ওটা সাদাই ছিল !

ঘটনার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ায় কে কীভাবে কখন মূর্চ্ছা গেল তা খেয়াল করার হয়তো সুযোগই ছিলো না। হাতের তালু দিয়ে ব্রম্মতালু চেপে ধরে রক্তক্ষরণ থামানোর চেষ্টা চালাতে চালাতে রিক্সা চেপে সোজা সদর হাসপাতালে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণাঞ্চলের নিরিবিলি সুনামগঞ্জ শহরটিতে প্রাইভেট কিনিক বলে এরকম কিছু ছিল না তখন। সরকারি হাসপাতালটাও জেলখানার সহাবস্থান ছেড়ে সরকারি কলেজের পাশ্ববর্তী এলাকায় ঠাঁই গাড়েনি তখনো।

মাথার দশাসই ব্যান্ডেজ ছেড়ে সেলাইটা তখনো শুকিয়েছে কি শুকায়নি। এডভেঞ্চারপ্রিয় মনে ভূত চাপলো বিমান বাহিনীতেই যোগ দেবো। পত্রিকায় কমিশন র‌্যাঙ্কে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেখে পুরনো ইচ্ছাটা চাগিয়ে উঠায় অন্য কোথাও ভর্তির চেষ্টাও করা হলো না আর। পরিবার থেকে আমার এমন হঠকারি সিদ্ধান্তে পূনর্বিবেচনা করার উপদেশ এলেও আমার গভীর বিশ্বাস ওখানে চান্স তো পাবোই। আমি না পেলে আর পাবেটা কে শুনি ! এদিকে খাসিলত কি আর পাল্টায় ! ইটিশপিটিশ করার সেনসেটিভ জায়গাগুলোতে মাথা ফাটার প্রাক ও পরবর্তী বিক্রম ফলানোর বীরত্বগাথা বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে মেয়েলী কণ্ঠের কলকলে হাসির মাদকতায় সেই বোধটাই কাজ করেনি যে, এগুলো কি প্রশ্রয়ের হাসি ছিল ? না কি ঝাঁকড়া ঘন বাবরি চুলের উত্তুঙ্গ গ্যালারির মাঝখানে জোড়াতালি চিকিৎসায় ছেটে ফেলাজনিত কেশোচ্ছেদি মধ্যতালুর বিস্তৃত খোলা মাঠ নিয়ে গোপালভাঁড় মার্কা যে অদ্ভুত চেহারাটা ধরেছিলাম, তার প্রভাব ? অতঃপর হেয়ার ড্রেসিং সেলুনের স্বচ্ছ আয়নায় ক্ষুরের নির্দয় পোচে পোচে নিজেকে দেখছি ! অর্ধমুণ্ডিত চেহারার ভাবগতি দেখে পূর্ণমুণ্ডিত রূপ কী হবে ভাবতেই স্বজন হারানোর মতো দুর্বহ শূন্যতায় কাঁদবো না কি থম ধরে বসে থাকবো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। ক্ষৌরকার লোকটি ছোট্ট তোয়ালেটা এগিয়ে দিয়ে ইঙ্গিত করলো চোখ দুটো মুছে নিতে। আহা, এক জীবনে মানুষকে কত কিছুই না হারাতে হয় !

বিমান বাহিনীর ভ্রাম্যমান ক্যাম্প বসলো সিলেট শহরেরই প্রখ্যাত একটা স্কুলে। ভর্তি পরীক্ষার সবগুলো প্রক্রিয়া এখানেই সম্পাদিত হবে, মায় চূড়ান্ত ফলাফল দেয়া সহ। নির্ধারিত দিনে বহু প্রার্থীর সমাগমে গিজগিজ করছে। প্রথম ইভেন্টেই আইকিউ এবং সাধারণ পর পর দুটো লিখিত পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ভীড়টা পাতলা হয়ে গেলো। দুপুরের পর পর দুপর্যায়ের মেডিক্যাল টেস্ট। এগুলো উত্তির্ণ হলে কনফিডেন্সিয়াল ভাইভা। মেডিক্যাল টেস্টের লাইন ধরেছি। রিটেনে ভালো করায় সিরিয়াল শুরুতেই পড়লো। কিন্তু আগে কি জানতাম কী বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছি ! তাহলে হয়তো এই জীবনেও এমুখো হতাম না। নবীন তারুণ্যের তরল আবেগে সেই মেয়েটির কাছে আগপাছ না ভেবে যে অনড় প্রতিজ্ঞা করে এসেছি, তাই এখন গলায় ফাঁস হয়ে গেছে। দেখো, পাইলট হয়ে তোমাকে বিমানে চড়াবোই চড়াবো, নইলে আর কখনোই এ মুখ দেখাতে আসবো না, এই নামটাই পাল্টে দেবো...! স্বেচ্ছাকৃত ছুঁড়ে আসা এই কথাগুলোই কানে বাজতে লাগলো একে একে। অভিজ্ঞতার পাঠে তখন কি আর জানা ছিল, আত্মবিশ্বাস ভালো কিন্তু অতিবিশ্বাস কিছুতেই নয় ?

আমাদের শহরের স্থায়ী কোনো বাসিন্দা নয় সে। মফস্বলের কোন্ দূর গ্রাম থেকে দূরবর্তী আত্মীয়তার সূত্রে এমন মিষ্টি যে মেয়েটি শহরে এসেছিলো ম্যাট্রিক পরীার্থী হয়ে পাশের বাড়িতে, জান্তে বা অজান্তে কখন যে প্রথম স্বপ্নের মধুবীজটি নিজ হাতেই রোয়ে দিয়েছিলাম বুকে..! দেখতে দেখতে তা চারা হয়ে গেলো ! ছায়ার আবেশ নিয়ে বেড়ে উঠছে সে দ্রুত...। শিকড়সহ একে অনাহুত উপড়ানোর অভিশাপ কী করে বইবো আমি..!
এটা কিসের দাগ ! প্রশ্নের ঝণঝণ ধাক্কায় সম্বিৎ পেলাম।
কিন্তু এ কী ! আমার আন্ডার-অয়্যার কোথায় ! এক আদিম অনার্য পুরুষ আমি দিগম্বর দাঁড়িয়ে ঠায়, নির্বিকার ! এক চিলতে সুতোবিহীন এমন মুক্তকচ্ছ মানব হিসেবে এ আমার প্রথম পাঠ, অভূতপূর্ব ! সুরমার জলে সাঁতরে সাঁতরে বেড়ে উঠা কৈশোর তারুণ্যে দুর্গময় তেমন কোনো বাথরুম তো ছিলো না যে আগে এমন বিরল অভিজ্ঞতায় সিঞ্চিত হবো ? ঘটনার অভিঘাতে তখন পুরোটাই যান্ত্রিক আমি। ভব্যতার লেশমাত্রহীন সামরিক লোক দুজন আমাকে উল্টে-পাল্টে হাতের স্টিকটি দিয়ে যথেচ্ছ নেড়েচেড়ে কী যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিলো তারাই জানে। আমি শুধু জানি মেডিক্যাল টেস্ট সেরে যে আমি বেরিয়ে এলাম সে অন্য এক আমি, যে এক লাফে অনেক বেশি সাবালক হয়ে গেছে।

চূড়ান্ত ভাইভার কনফিডেন্সিয়ালিটি আমার সেই জন্মদাগটিকেই চিনিয়ে দিলো আবার। এবং বুঝিয়ে দিলো এ দুর্ভাগা দেশে কখনো কখনো এমন সময়ও আসে যখন ঈশ্বর আর আল্লাহর মাঝখানে বিশাল এক ব্যবধান তৈরি হয়ে যায় ! এরপর জীবনে আরো কতো বিচিত্র পরীক্ষা এলো গেলো। কিন্তু সেদিনের সেই নাওয়া-খাওয়াহীন গোটা দিন শেষে এক ক্লান্ত ক্ষুব্ধ ভঙ্গুর বিকেল আমার ভাগ্যটাকে নির্ধারণ করে দিয়ে গেলো, তাঁর সাথে আর কখনোই যে দেখা হবে না আমার ! এবং কী আশ্চর্য, আমি চাইলেও সেই মেয়েটির সাথে আর কখনোই দেখা হয় নি !

আগে চুল সরিয়ে দেখতে হতো, এখন আর তার প্রয়োজন হয় না। সময়ের ঝড়ে উড়ে যাওয়া বনানীর মতো ফাঁকা তালুয় চিরুণী ঘষটানোর অভ্যস্ত কৌতুক করতে গিয়ে আয়নার গায়ে একটু খেয়াল করলেই খুব সহজেই লম্বা আড়াআড়ি দাগটা চোখে পড়ে। ভরা কলসীর ধারালো কানা বসে গিয়ে হা হয়ে যাওয়া চামড়ার ভাজ ডাক্তারি সেলাই দিয়ে ফের বুজে দেয়া হলেও এই বুজে দেয়ার অমোচ্য দাগই বলে দেয় ওখানটা একদিন হা হয়ে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের সেই কাদম্বিনীর মতোই, আগে যে মরে নাই সে এটা বুঝি মরিয়া প্রমাণ করিল !

সেই দিনটির পর দীর্ঘ সোয়া দুইটি যুগ পেরিয়ে গেছে। আমাদের বাসার গেটে যে কৃষ্ণচূড়ার চারাটি রুয়েছিলাম একদিন, সেটি আজ পূর্ণ বৃক্ষ। প্রতি বছর ফাগুন এলেই রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যায় তার। কিন্তু একই সময়ে রোপিত এই বুকের ভেতরের সেই চারাটি এখনো তেমনই রয়ে গেছে ! সপ্রাণ সতেজ। এবং বিষণ্নও। ছায়ার আবেশ নিয়ে এখনো বেড়ে উঠতে চায়...!
(১৭/০১/২০০৯)
[Published in the sachalayatan e-book "Khathgoray-golpo"]

Wednesday, November 19, 2008

@ ছেঁড়া ঘুড্ডি ...(০১)














ছেঁড়া ঘুড্ডি ...(০১)
রণদীপম বসু

‘যেখানে দেখিবে ছাই/ উড়াইয়া দেখ তাই/ মিলিলে মিলিতে পারে/ অমূল্য রতন...।’ কে লিখেছিলেন ? রামনিধি গুপ্ত ? ঈশ্বর গুপ্ত ? না কি অন্য কেউ ? এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে এই চরণগুলো সেই শৈশব-কৈশোরে স্তোত্রের মতো ঠোটস্থ করেই কি ক্ষান্ত হয়েছিলাম ? মোটেই না। স্তোত্র বা শ্লোক কি আর মিথ্যে হতে পারে !

আজ থেকে ত্রিশোধিক বছর পূর্বে মফস্বল শহরগুলোতে এখনকার মতো তো আর প্রাকৃতিক জ্বালানী গ্যাসের কায়কারবার ছিলো না। লাকড়ি, খড়ি, তুষ, শুকনো লতা-পাতা খড় নির্ভর চুলাসমৃদ্ধ বাঙালির রান্নাঘরের বাইপ্রোডাক্ট বর্জ্য হিসেবে ছাইয়ের চেয়ে হীন তুচ্ছ পদার্থ আমাদের ইহলৌকিক জীবনে আর কিছু ছিলো বলে জানা ছিলো না। পরিবারের সবচেয়ে অকর্মণ্য অপদার্থ ছেলেটিকেও যখন বলা হতো ‘তোর পাতে ছাই দেবো’, শতকরা নিরানব্বইভাগ সম্মানবোধহীন ছেলেটিরও বাকি একভাগ সম্মানবোধ ধপ করে জ্বলে উঠতো অপমানে ! দেশ-গাঁয়ের বাক্যবাণ সমৃদ্ধ ঝগড়াটে দুই প্রতিবেশিনীর ঝগড়ার চূড়ান্ত অস্ত্র প্রয়োগ হতো ‘তোর মুখে ছাই পড়ুক’ বলে। অতএব এতো হীনমানের বস্তুটি যে হাটেমাঠেঘাটে পথে গলিতে যত্রতত্র অতি সহজলভ্য হবে তাতে আর বিচিত্র কি !

আজ যারা অগ্নিমূল্যে ক্রয়কৃত মাছের সাথে মহার্ঘ গিফট হিসেবে এক পুটলি ছাই পেয়ে খুশিতে আটখানা হয়ে উঠেন, তাদের কথা ভেবেই সেই যুগের ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবি উপরোক্ত চরণগুলো রচনা করেছিলেন কিনা কে জানে। তবে অতি তুচ্ছ এই ছাইয়ের মধ্যে অমূল্য রতনের এতো সহজলভ্য উৎসের খোঁজ পেয়ে আমাদের সেই বালকবেলার রত্নপ্রাপ্তির প্রেরণা যে কোথায় গিয়ে ছুঁয়েছিলো তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে ! আশে পাশে কাছে দূরের যতো টাই করা ছাই আর ছাইয়ের ডিপো ছিলো প্রতিদিন সেগুলোর দশমদশারও দফারফা ঘটতে লাগলো। ঘাটাঘাটির চূড়ান্ত আর উড়ানো প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করে ব্যর্থ অনুসন্ধান শেষে প্রতি ত্রিসন্ধ্যায় যে ভস্মমূর্তি ঘরে ফিরে আসতো তার বর্ণনা আর না-ই দিলাম। এই ত্রিকালমূর্তি দশায় ‘ওরে মুখপোড়া, ওই ছাইভস্মের মধ্যে পড়ে না থেকে আমার হাড় জ্বালাতে এখানে এলি কেন ! যা হতভাগা ওই ছাইভস্মে যা!’ মায়ের অনিবার্য বর্ষণে তোয়াক্কা না করলেও ছাই সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞানতার করুণ হাল দেখে বিস্মিত হতাম বৈ কি। এতে অবশ্য পরের দিনের উদ্যমে কিছু মাত্র ভাটা পড়তো না। মা না জানতে পারে, তাই বলে ইস্কুলের বইয়ে কি আর মিথ্যে লিখেছে !

আহা, কি দিনগুলো চলে গেছে ! হঠাৎ করে আয়নায় একদিন দেখি আমি বড় হয়ে গেছি ! আসলেই কি বড় হয়েছি ? অমূল্যের সন্ধান না পেয়েই সেই রত্ন-সন্ধানী শৈশব আর কৈশোর কি সত্যিই হারিয়ে গেছে ? এক বিশাল শূণ্যতা বুকে নিয়ে এখনো ছাই খুঁজে ফিরি আমি। অথচ আশেপাশে তাকিয়ে মনে হয়, কী ভীষণ ছাইভস্মের মধ্যে এই জীবনটাকে নিয়ে গড়িয়েই যাচ্ছি কেবল ! কিন্তু কোথাও আর আমার সে-ই ছাই দেখি না...!
(১৯/১১/২০০৮)

[sachalayatan]