Showing posts with label Article (Micro-story). Show all posts
Showing posts with label Article (Micro-story). Show all posts

Friday, July 17, 2009

# [রম্যগল্প]...লিঙ্গান্তর...


লিঙ্গান্তর...
রণদীপম বসু

(০১)
হঠাৎ করিয়া একখান গায়েবী আওয়াজ হইলো- ‘ হে প্রাণীগণ, সৃষ্টির পুনর্বিন্যাসকাল আসন্ন। এবার প্রস্তুত হও। অনতিবিলম্বে তোমাদের মধ্যে পরস্পর লিঙ্গ পরিবর্তন করিয়া দেওয়া হইবে।’

চিরিং করিয়া উঠিয়া বসিলো আক্কাছ। অজান্তেই বাম হাতখানা অভ্যাসবশত তলপেট বাহিয়া নিচে নামিতে লাগিলো। এইটা কী শুনিলো ! বৈচিত্র্যহীন ছুটির দিনের মধ্যাহ্ণভোজ সারিয়া ক্রমে ক্রমে গরম হইয়া ওঠা মাথাটাকে নতুন কভার লাগানো বালিশখানায় ভালো করিয়া রাখিতেও পারিলো না, ওই পাশের ঘর হইতে স্ত্রী খালিজা বানু ওরফে কলিজা বেগমের হম্বিতম্বিটাও পুরাদমে শুনা যাইতেছে, আচমকা এই গায়েবী ঘোষণা ! এইটা কী করিয়া সম্ভব ! পুরুষগুলা সব নারী হইয়া নারীগুলি পুরুষ হইয়া যাবে ! নাহ্, সে ভুল শুনিয়াছে !

কিন্তু সে যে ভুলই শুনিয়াছে, এইটা ভাবিয়া নিশ্চিন্ত হইবার সুযোগ কোথায় ! তার আগেই লাফাইতে লাফাইতে কলিজা বেগম আসিয়া উপস্থিত- ‘ শুনতে পাইছো কিছু ?’ উল্লাসে লাল হইয়া ওঠা কলিজা বেগমের ভয়ঙ্কর মুখখানার দিকে ততোধিক আতঙ্ক লইয়া আক্কাছ রেহান ওরফে আক্কু রায়হান নির্নিমেষ চাহিয়াই রহিলো। ‘বহুৎ তেল হইছে তোমার, এইবার বুঝবা ! ডলা খাইলে জমাইন্যা তেল সব কেমনে বাইয়া বাইয়া পড়ে !’ কথার শেষে চুঁ চুঁ করিতে করিতে উৎফুল্ল কলিজা বেগম নাচিয়া নাচিয়া বাহির হইয়া গেলো।

‘ বেটা মিনষেগুলা বউৎ বাইড়া গেছে খালাম্মা ! এইবার এমন চিপা দিমু, খালি বাপ বাপ করবো !...’ কাজের বুয়া কদমির মা’র ঝাঁঝালো গলাটা অতি উচ্চমার্গে উঠিবার আগেই তাকে থামাইয়া দিয়া কলিজা বেগমের মিষ্টি-মধুর শাসানির শব্দ শুনা গেলো- ‘ চুপ করো তুমি ! আর শুনো, কাইল থাইকা তো তুমি আর বাসার কামে আইতে পারবা না ! এরপর থাইকা তোমার অই বাদাইম্যা পোলাটা কী জানি নাম, হ, অই কদমরেই পাঠাইয়া দিয়ো।’

অনতিবিলম্বে যাহা ঘটিতে যাইতেছে, তাহার ফলাফল কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে, আর কাহিনী যে কী হইতে যাইতেছে, তাহা আগাম কল্পনা করিয়া আক্কাছ শিউড়িয়া উঠিলো। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের দ্রুতি বাড়িয়া বুকখানা দ্রুত উঠানামা করিতে লাগিলো। তখনি হঠাৎ করিয়া সন্দেহ হইলো- বুকটা কি কিঞ্চিৎ উঁচু উঁচু লাগিতেছে না ! নিশ্চিত হইবার জন্য বাম হাতখানা পুনরায় নড়িয়া চড়িয়া উঠিলো। এবং তখুনি সেই সোহাগী ডাকে চমকাইয়া উঠিলো- “ আক্কুউউউউউ.....!” অর্থাৎ আবারো কলিজা বেগম। “ আমার আক্কু বেগঅঅঅম...।” নামের লিঙ্গান্তরিত সম্বোধন শুনিয়া আচমকা মাথায় আগুন ধরিয়া গেলো ! এক্ষুনি ইহার একটা বিহিত করিবার নিমিত্তে চিৎকার করিতে গিয়াও শেষপর্যন্ত করা হইলো না। বুকের ভিতরে কোথায় যেন একটা তীক্ষ্ণ ব্যথা মোচড় দিয়া উঠিলো। আর কীইবা বিহিত করিবে সে ! এখন আর তাহার যে কিছুই করিবার নাই। পরিস্থিতি পুরা পাল্টাইয়া যাইতেছে ! তবে এই আপত্তিকর সম্বোধনের হেতু বুঝিতেও দেরি হইলো না। “ তোমার অই লাফাঙ্গা ইয়ারটা, গাবলু না লাবলু, অইটারে যে দেখি না আইজ কাইল ! তারেও এইবার আইতে কইয়ো ! মাইয়া হইলে তারে যা খাসা লাগবো না ! উফ !...” হাওয়ার মধ্যে এক অনির্বচনীয় তৃপ্তির শীৎকার ছাড়িয়া কলিজা বেগম ভাসিতে ভাসিতে পুনরায় চলিয়া গেলো।

দরদর করিয়া আক্কাছের ঘাম বাহির হইতে লাগিলো। আর দমকাইয়া দমকাইয়া আফসোসগুলিও ছলকাইয়া উঠিলো, আহা, কী কুক্ষণেই না এই মায়াদয়াহীন খান্নাছ মাইয়ালোকটার চক্করে সে পা দিয়াছিলো ! পুরুষ মানুষের একটু আধটু এইদিক সেইদিক যাইবার অভ্যাস থাকিতেই পারে ! তাহা না হইলে পুরুষ হইলো কী করিয়া ! অন্যথায় এই স্বামী পরিত্যক্তা কলিজা বেগমই বা আক্কু রায়হানের ঘরে আসিতো কিভাবে ! সেইদিন যদি এলাকার লোকজন তারল্যে বুদ হইয়া থাকা আক্কাছকে কলিজা বেগমের ঘরে হাতেনাতে ধরিয়া ফেলিয়া জোর করিয়া তাৎক্ষণিক বিবাহ করাইয়া না দিতো, কোথায় থাকিতো এই কলিজা বেগম ? দ্বিতীয় বিবাহের বোঝা ঘাড়ে লইয়া ঘরে আসিতে না আসিতে অরিজিনাল স্ত্রীটাও কিনা এক কথার উপর উল্টা তালাক দিয়া বাচ্চাটাকে হাতে ধরিয়া বাপের বাড়ি চলিয়া গেলো ! থলথলে কয়েক মণ মাংস লইয়া এই কলিজা বেগম কী করিয়া বুঝিবে যে, সেই দুঃখ ভুলিয়া থাকিতেই আক্কাছ ওরফে আক্কু রায়হানের পুরুষ শরীরটা এখনো মাঝে মাঝে একটু আধটু এইদিক ওইদিক চলিয়া যায় !

চরিত্রে কিঞ্চিৎ তারল্য আসিলেও ধর্মেকর্মে আক্কাছের বিশ্বাস বা মতিগতি এখনও শেষ হইয়া যায় নাই। তদুপরি এই গায়েবি বাণীকেই বা অবিশ্বাস করিবে কী দিয়া ! কোথায় যেনো পড়িয়াছিলো সে, বাহ্যিক পরিবর্তন হইবার আগেই মানুষের আভ্যন্তরীণ পরিবর্তন শুরু হইয়া যায়। কলিজা বেগমের ভাবভঙ্গিতে যে সেই আলামতই স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে, তাহা তো আক্কাছ হাড়ে হাড়ে টের পাইতে শুরু করিয়াছে !

সদ্য রূপান্তরিত আক্কাছের তন্বী শরীরটার দিকে ষণ্ডাপুরুষদেহী বীভৎস কলিজা বেগম যেইভাবে অশ্লীল আগ্রাসী লোলায়িত ভঙ্গিতে আগাইয়া আসিতে লাগিলো, দেখিয়াই তন্বী দেহখানা তাহার থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিলো। চক্ষু মুদিলেই ভবিষ্যৎ পরিণতির এইরকম ভয়ঙ্কর দৃশ্য ভাসিয়া উঠিলে আক্কাছের আর স্থির হইয়া চক্ষু বুজিবার উপায় রহিলো না। ভূমিকম্প হইবার প্রাক্কালে প্রকৃতির মধ্যে যেইরূপ অস্থিরতা শুরু হইয়া যায়, পাখিরা ইহাদের গাছ-গাছালির আশ্রয় ছাড়িয়া উদ্দেশ্যহীন কিচির-মিচির করিতে করিতে অস্থির হইয়া যায়, বাহিরেও সেইরকম কোলাহল শুনা যাইতে লাগিলো। এবং সেই সঙ্গে আক্কাছকেও বুঝি অস্থির রকমের অস্থিরতায় পাইয়া বসিলো। এতোকালের দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রাভ্যাসখানিও তাহাকে এই জনমের মতো ছাড়িয়া গেলো, ইহাতে আর সন্দেহ রহিলো না। কিছুই ভালো লাগিতেছে না। শরীরখানাকে এইদিক ওইদিক বারকয়েক মোচরাইয়াও কোন লাভ হইলো না। অনতিবিলম্বে যে অসহনীয় অপমানের মুখাপেক্ষি হইতে হইবে তাহা ভাবিয়া হঠাৎ করিয়া আক্কাছের মরিয়া যাইবার ইচ্ছাটা জাগিয়া উঠিলো। এবং তৎক্ষণাৎ আর কিছু না ভাবিয়া শরীরে জামা-কাপড় চাপাইয়া ঝটপট ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলো।

(০২)
মরিবার জায়গারও কি এইরকম অভাব পড়িয়া গেলো ! মরিবার জন্য উপযুক্ত জায়গা খোঁজাও যে এতো বেশি কষ্টের কাজ তাহা আগে কখনোই বুঝিতে পারে নাই আক্কাছ। প্রতিদিন যত্রতত্র কতো মৃত্যুর সংবাদ পড়িয়াছে পত্র-পত্রিকায়। এইসব বালখিল্য কর্মকাণ্ডের ঘোর বিরোধীও ছিলো সে। কিন্তু আজ সেইসব ঘাটে-আঘাটে অকাতরে মৃত্যুপ্রাপ্তদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়া উঠিলো তাহার- সত্যি তো, কতো সাধ্য-সাধনা করিয়াই না তাহাদেরকে এই কাজে সফল হইতে হইয়াছে ! অবিশ্রান্ত হাঁটিয়া হাঁটিয়া শেষে শ্রান্ত ক্লান্ত হইয়া ফুটপাতের মধ্যেই বসিয়া পড়িলো আক্কাছ। শরীর আর টানিতেছে না। একটা রিক্সাও চোখে পড়িলো না। পড়িবে কী করিয়া ! প্যাডেলের উপর শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি যেটুকু উদ্যমের প্রণোদনা মিশাইলে শক্তি কর্মক্ষম হইয়া উঠে, তাহাই যে অনুপস্থিত। অতএব রিক্সা চালাইবে কে !

স্ত্রীর পৃষ্ঠের উপর চেলাকাঠ ভাঙিয়া যেইসব পুরুষকূল এতোকাল মরদবাজী দেখাইয়াছে, উহাদের অবস্থা আরও শোচনীয় দেখাইতেছে। আগাম ইঙ্গিত অনুভব করিয়াই কিনা উহারা রীতিমতো বিমর্ষ হইয়া পড়িয়াছে। তবুও শহর জুড়িয়া অস্থিরতা। কিন্তু কোথাও কোন উদ্যমের লেশমাত্র নাই। এই শেষ বিকালেও দোকানগুলির অধিকাংশেরই ঝাঁপ নামাইয়া ফেলা। দুই একটা যাওবা খোলা রহিয়াছে, ক্রেতাহীন বিক্রেতার ফ্যাকাসে মুখখানা হাতের চেটোর উপর ঠেশ দিয়া রাখা। রাজ্যের হতাশা ধারণ করিয়া অনিবার্য পরিণতির অপেক্ষায় বলীর পাঁঠার মতো নিশ্চুপ হইয়া আছে। এদিকে পুলিশী বরাদ্দের চাঁদা তুলিতে নির্ধারিত কেউ না আসিলেও ফুটপাতের ভ্রাম্যমান দোকানগুলিতে প্রাণের কোন স্পন্দন নজরে আসিতেছে না। রাস্তায় রাস্তায় মোড়ে মোড়ে যানজটের পরিবর্তে মানুষের জটই চোখে পড়িতেছে বেশি। কে কাহার উপর হুমড়ি খাইয়া পড়িতেছে, কে কাহাকে কিভাবে গুঁতো মারিতেছে এইসবে এখন আর কাহারও ভ্রক্ষেপই নাই। কে কাহার সঙ্গে কোথায় কিভাবে যাইতেছে কিংবা যাইবে সেইরকম তাড়া কিংবা কৌতুহলও নজর হইতেছে না। যেনবা মৃতদের মিছিল !

এইসব দৃশ্য পরিদৃশ্য প্রত্যক্ষ করিয়া আক্কাছ আরো বেশি মুষড়াইয়া পড়িলো। কতকাল আগে বাপ-মা মরিয়া গেলেও যেই অনুভূতি কখনো হৃদয়ঙ্গম করে নাই, আজ তাহার নিজেকে বড়োই এতিম মনে হইতে লাগিলো। সে এখন কী করিবে কোথায় যাইবে কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছে না। কোন পার্ক-টার্কে গেলে কেমন হইতো ! কিন্তু সেই উপায়ও নাই। শহরের কোন শৃঙ্খলাই আর অবশিষ্ট নাই। একেবারে দুমড়াইয়া মোচড়াইয়া সবকিছু এলোমেলো হইয়া গিয়াছে যেন। হঠাৎ আক্কাছকে খুব আতঙ্কে পাইয়া বসিলো। মরিতে তো পারিলোই না, এখন কি এই রাস্তার মধ্যেই পড়িয়া থাকিতে হইবে ! কোনরূপ সিদ্ধান্তে আসিবার আগেই একসাথে কতকগুলি হাসির শব্দে চমকাইয়া উঠিলো।

কতক মেয়েছেলে তাহাকে ঘিরিয়া ধরিয়াছে। কিন্তু মেয়েছেলেগুলোর চেহারায় রমণীসুলভ কমনীয়তার কোন ছোঁয়া আছে বলিয়া মনে হইলো না। তাহার বদলে কী রকম পুরুষালী ভাব প্রকট হইয়া উঠিতেছে। প্রথম দৃষ্টিতে হিজড়া বলিয়াই ভ্রম হয়। এদিক সেদিক তাকাইয়া খেয়াল করিলো সে, আরো যেসব মেয়েছেলেরা একটু বেশিরকমভাবেই রাস্তায় আসা-যাওয়া করিতেছে, সবার মধ্যেই এইরকমের পুরুষালী ভাব প্রকাশ পাইতেছে এবং তাহাদের চলনে-বলনেও লজ্জাশীলা কোমলতার জায়গায় ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষিত হইতেছে। ঘিরিয়া ধরা মেয়েছেলেগুলির একজন তো তাহার উদ্দেশ্যে ফিস করিয়া মুখে শিষ দিয়া বসিলো ! ডোন্ট-কেয়ার ভাবের আরেকজন আক্কাছের চোখে চোখ মারিয়া নিজের ঠোঁটগুলি যেইভাবে চাটিতে লাগিলো, তাহাতে অবস্থা খুব সুবিধার মনে হইলো না ! এবং তখনি তাহার তলপেটে তীব্র একটা ব্যথা চাগাইয়া উঠিতে লাগিলো। হায় আল্লাহ্, সময় কি তাহলে আসিয়া পড়িলো ! ব্যথার সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে কী রকমের একটা অনুভূতিও জাগিয়া উঠিতেছে !

নিরূপায় আক্কাছের কী মনে হইলো কে জানে ! এই ঘোর সন্ধ্যাবেলায় শহরের একটা বিশৃঙ্খল রাস্তায় বেঘোরে ছিঁড়াফাড়া হইবার জন্য নিজেকে বিলাইয়া দেওয়ার চাইতে চক্ষের বিষ হইলেও কলিজা বেগমকেই শ্রেয় মনে হইতে লাগিলো। সময় দ্রুত ফুরাইয়া যাইতেছে ! ইহা ভাবিতেই ঝটকা মারিয়া দাঁড়াইয়া গেলো সে এবং উহাদের বেষ্টনি মারাইয়া পড়ি কি মরি হইয়া উর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়াইতে লাগিলো। পিছন হইতে উহারাও বুঝি তাড়া করিলো। ক্রমশই নিকটবর্তী হইতে থাকা পায়ের শব্দে আক্কাছ তাহার নিজের গতি আরও বাড়াইয়া দিতেই কিসের উপর যেন হুমড়ি খাইয়া পড়িয়া গেলো।

(০৩)
বেলা দ্বিপ্রহরে লোডশেডিং-এর সিদ্ধ গরমে ঘুমের মধ্যেই পাশে শায়িত স্ত্রী কলিজা বেগমের সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করিয়াছিলো কিনা ঠাহর করিতে পারিলো না। কিভাবে যেন খাট হইতে ছিটকাইয়া মেঝেতে পড়িয়া আক্কাছ সম্বিৎ ফিরিয়া পাইলো বটে। কিন্তু কিছুতেই সে নিশ্চিত হইতে পারিতেছে না, বিন্যাসমুহূর্তের আগে না কি পরে সে অবস্থান করিতেছে ! গায়েবী আওয়াজের কথা মনে হইতেই চিরিং করিয়া উঠিয়া বসিলো এবং অজান্তেই ফের বাম হাতখানা তাহার অভ্যাসবশত তলপেট বাহিয়া নিচে নামিতে লাগিলো...!

[sachalayatan]
[somewherein]
[mukto-mona]
[khabor.com]
[sa7rong]
[horoppa.wordpress]

Sunday, June 14, 2009

# [রম্য] সচলাড্ডা, না কি বোম ভোলানাথ...!


সচলাড্ডা, না কি বোম ভোলানাথ...!
রণদীপম বসু

সময় সমাসন্ন, অথচ মেলার আয়োজক ভোলাবাবার বিশিষ্ট ভক্ত প্রখ্যাত আহমেদুর রশিদ টুটুলের কোনো পাত্তা নেই। এদিকে ভোলানাথের শিষ্যরা একে একে আসতে শুরু করেছেন। আয়োজন ভেনু শুদ্ধস্বরের সত্ত্বাধিকারী হিসেবে নিজের আসনটিসহ ওখানে আসন সংখ্যা সাকুল্যে চারটি, যা ইতোমধ্যেই দখল হয়ে আগত শিষ্যরা যার যার কারিশমা দেখাতে শুরু করে দিয়েছেন। হঠাৎ ফোনে আয়োজক টুটুল নিজে উপস্থিত থাকতে পারছেন না এরকম ব্যাখ্যা শুনে মেলার কো-অরডিনেটর বিপ্লব রহমানের চান্দি এন্টিক্লকওয়াইজ চক্কর শুরু করে দিয়েছে। এখন উপায় ! পরীক্ষিত শিষ্য নজরুল ইসলাম বাবার প্রসাদ পেতে দেরি দেখে খেকখেক শুরু করে দিয়েছে। প্রসাদ নয়, বাবাকে পছন্দের প্রায়োরিটি দিয়ে অতি ভদ্র কবিশিষ্য তারেক রহিম নিজেকে শান্ত রাখার রিহার্সেল দিচ্ছে। তাঁকে আবার উত্তমভাবে চর্চার প্রক্রিয়া শিখিয়ে দিচ্ছে গাল্পিকশিষ্য পান্থ রহমান রেজা। যার একারই একত্রে চার-চারটি আসন দরকার হয়, নিরীহ পর্বতাকার শিষ্য শাহেনশাহ সিমন তো ঢুকেই তেড়ে গেলো নজু ভাইয়ের দিকে। ভোলাবাবার প্রসাদের প্রতি এমন বেলায়েক মন্তব্য ! আর টেকনিক্যাল শিষ্য গৌতম রায় বেশ লিনাক্স মুডে তা পর্যবেক্ষণ করছে। অবস্থা বেগতিক দেখে অর্ধমাত্রার বায়বীয় প্রসাদের সাপ্লাই দিয়ে কো-অরডিনেটর বিপ্লব দা’ তখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আর একই সাথে আয়োজকের গোষ্ঠী উদ্ধার করে যাচ্ছেন। কী আশ্চর্য, বাবার স্বঘোষিত চেলা গোঁসাই লীলেনেরও খোঁজ নাই !


যাদের জন্য এই বিশেষ আয়োজন, বহুদিন বাবার প্রসাদ বঞ্চিত প্রবাসী শিষ্যদ্বয় ইংল্যান্ড থেকে সুবিনয় মুস্তফি আর সিংগাপুর থেকে ফারুক হাসান এসে পৌঁছামাত্রই বিপ্লব দা’কে হঠাৎ করে ঝাপসা দেখা যেতে লাগলো। ব্যাপার কী ? অতি ঘূর্ণনগতির কারণে বস্তুর অবয়ব নাকি ঝাপসা হয়ে যায়। রীতিমতো হাঁকতে লাগলেন- বাইরে আসো সবাই, বাইরে আসো ! কী ব্যাপার ? তিনি আবার কোন্ ঘটনা ঘটিয়ে ফেললেন ? হুড়মুড় করে সবাই বেরিয়ে দেখি ৯১ আজিজ কো-অপারেটিভ মার্কেটের তৃতীয় তলার দ্বিতীয় গলিটির শুদ্ধস্বর নামের যে ঘরটিতে এতোক্ষণ আমরা অবস্থান করছি তার সামনের প্যাসেজ দখল করে কোত্থেকে গুটি কয়েক ছেঁড়া মাদুর যোগার করে করিৎকর্মা বিপ্লব দা’ আসরের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। মার্কেটের বাদবাকী দোকান-মালিকরা কষে মার না দিলেই হয়।


শুরু হলো হুড়োহুড়ি। কে আগে জাকিয়ে বসবে সেই কম্পিটিশানে শিষ্যদের ব্যক্তিগত দক্ষতার যে প্রদর্শনী চলতে লাগলো তার মাঝখানেই সদ্য আগত বাবার আরেক একনিষ্ঠ ভক্ত এনকিদুর ছ্যাৎছুৎ ! তাঁকে পছন্দসই জায়গা ছেড়ে দেয়া না হলে সে যে টেকি-কার্টুন এঁকে এইসব হতচ্ছাড়া শিষ্যদের বর্তমান হালচালের বেড়াছেড়া অন্তর্জালে ফাস করে দেবে, সেই নমূনা হুমকী দেখাতেও কসুর করলো না।

শুরু হলো বিপ্লব দা’ কর্তৃক বাবা ভোলানাথের প্রসাদ বিতরণ। প্রসাদ সেবনের সে যে কী মাজেজা ! এরপর যা ঘটতে লাগলো তা বর্ণনা করবো কী ! ভাষাতেই লেগে গেলো ছেড়াবেড়া ! অতএব সে চেষ্টা আর না করে বরং আসুন সবাই চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করে নেই !

ছবি ০১। কো-অরডিনেটর বিপ্লব রহমান আইন-শৃঙ্খলা তদারকিতে ব্যস্ত। সাথে সহযোগী প্রধান পাণ্ডা হিসেবে বাছাই করেছেন ধলাপাহাড় শাহেনশাহ সিমন’কে।

ছবি ০২। আহা ! ভোলাবাবার প্রসাদের কী মহিমা !

ছবি ০৩। প্রসাদের মহিমায় পাহাড়ও উল্টে গেলো !

ছবি ০৪। বড় বেশি লেট করে ফেললেও এসেই বাবার চেলা হিসেবে নিজের মারাত্মক গুরুত্বটুকু বোঝানোর চেষ্টা করছেন গোঁসাই লীলেন।

ছবি ০৫। 'অই, পিছন থাইকা উঁকি দেয় কেডায় রে !'

ছবি ০৬। 'আমারে চিনছ্ !'

ছবি ০৭। বোম বাবা ভোলানাথ !

ছবি ০৮। কিচ্ছু নাই ! সব মায়া !


[sachalayatan]

Friday, May 15, 2009

# [রম্য-গল্প] --- চটাশ !


...চটাশ !
রণদীপম বসু

চটাশ্ !
চমকে ঘুরে তাকালাম। হতভম্ব লোকটা ডান হাত দিয়ে সম্ভবত বাঁ গালটাকে চেপে রেখেছে। অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এরকম কিছু ঘটতে পারে ! তাঁর বাঁ হাতটা টেনে ধরে মেয়েটি এক ঝটকায় পাশের খালি রিক্সাটায় উঠে বসলো এবং লোকটাকে টানতে লাগলো। শাহবাগের এই জনাকীর্ণ মোড়ে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এমন অভূতপূর্ব ঘটনায় আমার মতো কৌতুহলী দর্শকের অভাব থাকার কথা নয়। লোকটা কী বুঝলো কে জানে, আশপাশ তাকিয়ে ঝট করে সেও উঠে বসলো মেয়েটির পাশে।

কী বুঝলি ?
মামা’র দিকে তাকিয়ে আমি মাথাটা এদিক-ওদিক বার দেড়েক নাড়ালাম শুধু। অর্থাৎ কিছুই বুঝি নি।
তুই একটা গাধা !
বাসা থেকে মামা’র সাথে বেরোনোর পর বিগত ঘণ্টা-দুয়েকের মধ্যে সম্ভবত এটা আমার ছাব্বিশতম খেতাব অর্জণ ! ভীষণ বিজ্ঞ টাইপ ব্যক্তি হিসেবে মামা’কে আমার খুবই পছন্দ। পৃথিবীতে হয়তো এমন কোন বিষয়ই নেই যা জানতে চাইলে মামা তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এর একটা না একটা ব্যাখ্যা দেবেন না। ব্যাখ্যা তো নয়, বক্তৃতা ! জীবনে একবারই ইস্কুলের ডায়াসে উপস্থিত বক্তৃতা করতে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে পড়েই যাচ্ছিলাম। সেদিনই বুঝেছিলাম, বক্তৃতা করাটা হচ্ছে পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটি। যার জন্য কিনা ভয়ঙ্কর বিজ্ঞতা আর যোগ্যতা থাকা অতি জরুরি। আর এই কাজটিই যখন-তখন যেখানে-সেখানে অবলীলায় করে ফেলার মতো লোক পৃথিবীতে হাতে গোনা ক’টি আছে ! তাদের মধ্যে আমার মামা যে একজন হবেনই, তাতে আর সন্দেহ কী ! অতএব তাঁর কাছ থেকে এরকম পাঁঠা, ছাগল, উল্লুক, গাধা, বলদ, খাটাশ এজাতীয় নিরীহ প্রাণীজ টাইটেল পেতে পেতে আমার যে আর একটুও খারাপ লাগে না, মামাও তা জানেন। এবং মামা যে জানেন, সেটাই হয়েছে জ্বালা ! কিন্তু মামা’র তাতে বিন্দুমাত্র সমস্যা বা বিরক্তি আছে বলে মনে হয় না। বরং অজ্ঞানকে জ্ঞান বিতরণের দাতব্য উদ্যমে মামা’র কোন ঘাটতি কখনোই দেখা যায় নি। আর এ মুহূর্তে আপন ভাগ্নের অজ্ঞানতাকে হেলাফেলা করার তো প্রশ্নই আসে না !

এটাকেই বলে প্রেম, বুঝলি !
প্রেম ! বলে কী ! আমার ছোট্ট আলজিহ্বাটা গলায় পেঁচিয়ে যাবার জোগাড় !
আরে ! এতে আশ্চর্যের কী আছে ! রামছাগলের মতো এমন হা করে আছিস কেন ?
কোথায় যেন পড়েছিলাম, ছাগলই নাকি একমাত্র দার্শনিক প্রাণী, জবাই করার আগেও যে নির্বিকার থাকে। এটা নাকি তার চোখ দেখলেই বুঝা যায়। কিন্তু মামা’র দেয়া তথ্যের সাথে সেটা যে কিছুতেই সাপোর্ট করছে না ! সেইসব তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণের আগেই মামার দ্বিতীয় পর্বের জ্ঞানদান শুরু, তাও একেবারে সাধু ভাষায়-
এই চর্মচক্ষে যাহা দেখা যায়, তাহা সত্য নহে; চক্ষের আড়ালে যাহা ঘটিয়া থাকে তাহাই সত্য ! গাধারাই কেবল যাহা দেখে তাহাই সত্য ভাবে। এই যেমন ধর্...
মামা’র জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতার তোড় যত বাড়ছে, আমার মাথাটাও তত জোরে ঘুরতে লাগলো। এবং আফসোসের সাথে আশঙ্কাটাও পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগলো, সুবর্ণার সাথে বিকেলের প্রোগামটায় টাইমলি এটেন্ড করতে পারবো তো ! সে আশায় গুড়েবালি হবার সমূহ ইঙ্গিত এখনই টের পাচ্ছি। ফলে মামা’র প্রতিও বুঝি এক ধরনের অসন্তোষ ভেতরে ভেতরে তৈরি হতে লাগলো।
কীরে ! উল্লুকের মতো এমন মোচড়ামোচড়ি করছিস কেন ? কথা বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি ! আয় আমার সাথে...
আহ্ হা ! থাক না মামা !
কে শুনে কার কথা ! হাত ইশারায় একটা রিক্সা ডাকলেন। আমার আপত্তি অগ্রাহ্য করেই রিক্সার দিকে এগিয়ে গেলেন। ইশ্ ! কী কুক্ষণে যে মামার সাথে বেরোতে গেলাম ! এখন নিজেই নিজের চুল ছিঁড়া ছাড়া কিচ্ছু করার নেই !

মামা’কে নিয়ে এই এক বিপদ। কোথাও বেরোবে, সাথে সাথে ভাগ্নের তলব। কিন্তু আমার যে কলেজ আছে মামা !
সে কী রে ! তুই তো দেখি সত্যি সত্যি অপদার্থই রয়ে গেলি !
কেন ? একথা বলছো কেন মামা ?
বল্ তো, শিক্ষা মানে কী ? শুরু হয়ে গেলো মামা’র জেরা।
নিরীহ ছাত্রের মতো বলি- শিক্ষা মানে কিছু জানা বা শেখা !
তুই একটা মূর্খ !
ভাগ্নের অজ্ঞতায় মামা রীতিমতো তাঁর অসন্তুষ্টি ঝাড়তে লাগলেন- শোন্, শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞানার্জনের উৎকৃষ্ট উপায় অনুসন্ধান। তুই যে কলেজে যেতে চাচ্ছিস, কেন জানিস ?
আশ্চর্য ! আমি কেন কলেজে যাবো, আমি জানবো না !
না, তুই জানিস না। তুই যেতে চাচ্ছিস জ্ঞান নয়, জ্ঞানার্জনের উপায় খুঁজতে। আর আমার সাথে এখন যে বেরোবি, তাতে কী হবে বল্ তো ? তোর অনেক উপকার হয়ে যাবে। অনেক কিছুই জানতে পারবি তুই। প্রত্যক্ষ জ্ঞান। ওই কলেজ সাত জন্মেও তোকে ওগুলো দিতে পারবে ?
এবার হয়তো কিছুটা আঁচ করতে পারছি, সেই প্রথম বয়সে কেন মামা হঠাৎ করে কলেজ যাওয়া বন্ধ করে পড়ালেখার পাটটাই চুকিয়ে দিয়েছিলেন।

তবে অসম্ভব পড়ুয়া হিসেবে মামা’র নামডাক যে-কারোর জন্যেই ঈর্ষণীয় হতে পারে বৈ কি ! অত্যাবশ্যকীয় সঙ্গি হিসেবে নানান কিসিমের বই সংগ্রহের প্রবল তাড়নায় ঘরের ধান চাল হলদি মরিচ ইত্যাদি জিনিসপত্র বেমালুম হাওয়া করে দিয়ে মাঝে মাঝেই মামা যে নানার অনিবার্য খড়ম-চিকিৎসা আর ঘাড়ধাক্কা খেয়ে দিন-কয়েকের জন্য অদৃশ্য হয়ে যেতেন, সেটা আমাদের স্কুল পড়ুয়া ভাগনেদের কাছে তখন তো খুবই রোমঞ্চকর ঘটনা হিসেবেই মর্যাদা পেতো। রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষাগুলো শেষ হতে চাইতো না, কবে মামা ফিরে এলে রোমহর্ষক অভিযানের গল্পগুলো রসিয়ে রসিয়ে জাবর কাটবো। আমাদের ঢাকার বাসার গেটে মামার হাঁক-ডাক শুনা মাত্র মা ঠিকই দরজা আগলে দাঁড়িয়ে যেতেন- শোন্, এটা তোর বাড়ি না। ঘরের একটা জিনিস এদিক-ওদিক হবে তো...
দেখ্ বুবু, তুই এখনো তোর সেই বিশ বছর আগের অপরিণত জ্ঞান নিয়ে অপরিপক্কই রয়ে গেছিস। এই অজ্ঞানতা নিয়ে তোর ঘুম আসে কী করে !
কী বললি ! আমি অপরিপক্ক ! অপরিণত ! বেরো, এক্ষুনি বেরো ! খবরদার, তুই ঘরে ঢুকবি না বলছি !

মাকে চটিয়ে দেয়া মানে সন্ধ্যায় বাবা না ফেরা পর্যন্ত বাসায় এই টর্ণেডোর ঘূর্ণি আর থামছে না, এই নিশ্চিত পূর্বাভাস সবারই জানা। তবু কেন যে মামা প্রতিবারই এরকমটা করেন তা আমার কাছে বোধগম্য না। মা’র পায়ের কাছে ব্যাগটা ফেলেই বলবে- আমি তো বেরোতেই এসেছি ! এই নে, ব্যাগটা রাখ্। এরপর ‘ভাগ্নে’ বলে একটা হাঁক দিয়েই সোজা বাইরে। আমিও সুরুৎ করে মামার পিছু। বাবা না ফেরা পর্যন্ত বাসাটা যে কিছুতেই আর নিরাপদ নয়, সেই টেটনা বয়সেই এ অভিজ্ঞতার পাঠ নেয়া সম্পন্ন আমার। ঝড়ের বেগে শহরটাকে চষে ফেলে প্রাথমিক অভিযানটা সেরে সন্ধ্যে নাগাদ গেটের ধারে বারার জন্য অপেক্ষা আমাদের। অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি উৎফুল্ল বাবা রিক্সা থেকে নেমেই মামার সাথে চোখাচোখি সেরে মার সামনে গিয়ে পকেটে হাতটা ঢুকিয়ে দেবেন। বাবার মুচকি মুচকি হাসিটা সেদিন বেশ দেখার মতো হয়। ততক্ষণে মার দিকে বাড়িয়ে ধরেছেন এক পাতা প্রেসারের টেবলেট। আর এদিকে দ্রুত আমরা আমাদের কক্ষের নিরাপদ আশ্রয়ের শেল্টার নিতে দে ছুট।

কিন্তু নানা’র মৃত্যুর এক মাসের মধ্যে নানীও মারা যাবার পর এবারই প্রথম একটু ভিন্নতা দেখা গেলো। বাসার গেটে মামার হাঁকডাক শোনা গেলেও মা আর আগের মতো এসে দরজা আগলে দাঁড়ালেন না। রুমে ঢুকেই কাঁধ থেকে ব্যাগটা প্রায় ছুঁড়ে ফেলে মামা’র খলবলে প্রশ্ন- কীরে ভাগ্নে, বুবুর তবিয়ত ঠিক আছে তো !
কেন, কী হয়েছে মামা ! এ কথা বলছো যে ?
চল্ চল্ দেখে আসি !
মামা’র পিছু পিছু আমিও মা’র ঘরের দিকে এগিয়ে যাই। তবে দরজার বাইরে থেকেই আমি ভাই-বোনের কুশল-বিনিময়ের আলামত শুনতে পাই। কোন ভূমিকা ছাড়াই মা’র বাক্যবর্ষণ শুরু হয়ে গেলো- দেখ্, তোর কারণে আব্বা-আম্মা এতো তাড়াতাড়ি চলে গেছে। তোর যদি একটুও হায়া-শরম থাকতো, তাইলে আরো ক’টা দিন হয়তো তাঁরা নতুন বৌয়ের মুখ দেখে সেবা-যত্ন নিয়ে শান্তিমতোই...
কথা আর শেষ হয় না। তার আগেই মা’র ফোঁপানো শুরু হয়ে যায়।
দেখ্ বুবু, এসব ফুৎফাৎ আমার সামনে করবি না ! কথা যা বলার শেষ করে তারপর আরামসে বসে যত খুশি ফুৎ ফাৎ করতে থাক্, আমার অনেক কাজ আছে।
মামা’র এই চোটপেটে কথা শেষ হতে না হতেই মা-ও ফোঁস করে ওঠেন- এই, তোর কাজ কী রে ? বারো ভুতের জিম্মায় ঘর-বাড়ি জমিজমা ফেলে বাদাইম্যাগিরি করতে এসেছিস। এটাই বুঝি তোর কাজ ! একটা বৌ জোটানোর মুরোদ নাই যার, তার আবার এতো সিনাজুড়ি কিসের শুনি !
হা হা হা হা ! এই হলো তোদের মেয়েদের সাইকোলোজি, বুঝলি ? পুওর, ভেরি পুওর...!
কথাটা বোধয় অসম্পূর্ণই থেকে গেলো। হুটহাট করে মামা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। আমাকে দেখেই এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন, যেনো কত্তো তাড়া রয়েছে তাঁর !
চল্ ভাগ্নে চল্, হাতে অনেক কাজ !
জীবনভর এতো ব্যস্ত-সমস্ত মামা’র আসল কাজটা যে কী, এটা আর জানার সৌভাগ্য হয়নি আমার ! কিন্তু আজ তো সে রিস্ক নেয়া যায় না ! সুবর্ণার সাথে প্রথম প্রোগ্রাম আমার। কথা ঘুরিয়ে বলি, মামা, আজ যে একটু ব্যস্ত আমি ?
বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কতক্ষণ। এই, তোর বয়স কতো হয়েছে রে ?
হুট করে এমন প্রশ্নে কিছুটা অস্বস্তি নিয়েই বললাম- হঠাৎ এরকম বয়স নিয়ে টানাটানি শুরু করলে যে !
হা হা হা ! আমার গর্দভ ভাগ্নেটা বড় হয়ে যাচ্ছে রে !
ঘরের ভেতরে মা রীতিমতো ফুঁসে আছে। তার ওপরে মামা’র কথা বে-লাইনে চলে যাবার আশঙ্কা চাপা দিতেই তাড়াতাড়ি বললাম- ঠিক আছে, চলো। এই চলো’টাই যে আমাকে এতো ফক্করে ফেলবে, তা কে জানতো !

আগের রিক্সাটাকে ফলো করেই কিছুদূর গিয়ে রিক্সা থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলেন মামা। আমিও ফেউয়ের মতো তাঁর সাথে। রমনা পার্কের ভেতরে ঢুকে গেলো ওরা। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে মেয়েটি সেই লোকটির হাত ছাড়ে নি এখনো। দিনের এ সময়টাতে ভালো করে লোকজনের ভিড় জমে ওঠেনি। লেকের পাড়ের নির্জন কোণাটাতে যেখানে ঝোপঝাড় একটু বেশিই মনে হচ্ছে, বড় গাছটাকে আড়ালে রেখে খালি বেঞ্চটাতে বসে পড়লো ওরা। গাছটাকে লক্ষ্য করে শিকারি কুকুরের মতো মামা এগিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে পাশেই আরেক ঝোপের আড়ালে দুটো ছেলে আর মেয়ের ঠোঁটগুলোকে কারা যেন সুপার-গ্লু দিয়ে একজায়গায় এনে আটকে দিয়েছে ! মামা’র সেদিকে খেয়ালই নেই। একটা অস্বস্তির মতো কি যেন বুকের মধ্যে খুট খুট করতে লাগলো। থেমে গেলাম আমি। এরং সাথে সাথেই টান পড়লো হাতে। কখন যে মামা আমার হাতটা ধরেছেন, আগে টের পাইনি।
না মামা, আমি আর যাবো না।
যাবি না মানে ! শিখে যা গর্দভ ! জীবনে কাজে লাগবে।
গাছটাকে কোণাকোণি আড়াল বানিয়ে নিপাট ভালোমানুষের মতো কাছাকাছি যেতেই চাপা ধস্তাধস্তির খশখশ আওয়াজ- অই মাগির পুত, তর বাপেও কি মাইয়া মাইনষের গতর দেহে নাই... !
থমকে গেলাম ! কানের মধ্যে কে যেন গরম সীসা ঢেলে দিয়েছে। দেখি মামা’র বিস্ফারিত গোল গোল চোখ দুটো বেরিয়ে আসতে চাইছে ! হঠাৎ পাগলের মতো আমার হাতটাকে ফের খপ করে ধরে হিড়হিড় করে আমাকে টেনে নিয়ে ছুটলেন রুদ্ধশ্বাসে, গেটের দিকে।

হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন- তুই কি কিছু শুনেছিস ?
হাঁ শুনলাম তো... !
চুপ চুপ ! মূর্খ ! এই বেয়াক্কেলের মতো ঝুলে পড়া কান দুটো দিয়ে যা শোনা যায় তা-ই পারফেক্ট সত্য না ! সত্য হচ্ছে...
মামা’র লেকচার তুবড়ি ছুটানোর আগেই এগিয়ে আসা টাউনবাসটার দিকে ছুটলাম আমি- মামা তুমি পরে আসো, আমি গেলাম।
সুবর্ণার সাথে প্রোগ্রামের টাইম ছাড়িয়ে ঘড়ির লম্বা কাটাটা আগে আগে ছুটছে তখন...!
Image: 'Syndafall' by Michelangelo.
(১৪/০৫/২০০৯)

[sachalayatan]

Monday, May 11, 2009

# [অনুগল্প] --- ভৃঙ্গু কোবরেজ!


ভৃঙ্গু কোবরেজ
রণদীপম বসু

ধারণা করা হয ভৃঙ্গু কোবরেজের নামটা তাঁর পিতৃ-প্রদত্ত নাম নয়। তবুও এই নামটাই তাঁর আদিনাম ছাপিয়ে কী করে যে দশ গ্রাম পেরিয়ে বহু দূর দেশেও খ্যাতি পেয়ে গেলো, এর কোষ্ঠি বিচার করার বয়েসী কেউ আর জীবিত নেই এখন। কিংবা আদৌ তাঁর কোন আদিনাম ছিলো কিনা সেটাও কোবরেজের নির্বিকার ঘোলা চোখ পাঠ করে কোন সুরাহা মেলে না। তাই সবক্ষেত্রে যা হয়, ক্লু হারিয়ে নাম নিয়ে আগ্রহ বা কৌতুহলগুলো তাঁর বয়সটার মতোই বহুকাল আগেই থমকে গেছে।

আর বয়সের কথা বললে, সেই যেবার তাঁর সদ্য বিয়ে করা বড় ছেলেটা অজানা মাড়িতে ভুগে ঘরের খুঁটির সাথে বাঁধা থাকা অবস্থায় মরে গেলো, সেবার মালোপাড়ার দক্ষিণ চাতালে মেয়ে বিয়োতে গিয়ে মরে যাওয়া আবিয়ত্তা মেয়েটার পিতৃপরিচয়হীন সদ্যজাত যে অভাগা মেয়েটাকে ভৃঙ্গু কোবরেজই কোলে করে নিয়ে এসে নিজেই লালন পালন করতে থাকে, কী আশ্চর্য, সেই মেয়েটাই লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে কবে থেকে যে বছর বছর মরা বাচ্চা প্রসব করে যাচ্ছে, অথচ কোবরেজের কাচাপাকা চুলগুলো ঠিক সেরকমই রয়ে গেছে আজো ! কেউ বলে কোবরেজের অপ্রকৃতিস্থ ছোট ছেলেটা, যে নাকি মাঝে মাঝেই কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গিয়ে আবার ফিরেও আসে, তার সাথেই মেয়েটার বিয়ে হয়েছিলো, কেউ বলে হয় নি। তবে এ নিয়ে গ্রামের কাউকেই খুব একটা মাথা ঘামাতে দেখা যায় না।

গ্রামের একপাশে নির্বিবাদে পড়ে থাকা কোবরেজের আদিবাস নিয়েও কেমন একটা ঘোরপ্যাঁচ রহস্য রয়ে গেছে। কবে কোন্কালে কিভাবে কোবরেজি চিকিৎসায় দত্তবাড়ির কাকে সারিয়ে তোলার সৌজন্যে দানস্বত্বে পাওয়া একটুকরো জংলা জমিতে ছোট্ট একটা ঘর তুলে বসবাসের পত্তন করে পসার জমিয়ে তুলেছিলো, সেকালের সাক্ষী কেউ বেঁচে থাকলে হয়তো তা জানা যেতো। সাথে এটাও জানা যেতো, যে বউটি যুবতীকালে দুটো বাচ্চা বিইয়ে রেখে একদিন কোথায় হারিয়ে গেলো, তাকে কি কোবরেজ সত্যি সত্যি বিয়ে করে এনেছিলো, না কি ভাগিয়ে এনেছিলো ?

পরতে পরতে এমন রহস্য জমে থাকাটা চিকিৎসা পসারের ক্ষেত্রে অনুকূল হবে নিশ্চয়ই। নইলে কালেভদ্রে দুয়েকটা অসমর্থিত খবরের বাইরে কোথাও কোনো আরোগ্য সংবাদ পাওয়া না গেলেও ধন্বন্তরি তাবিজের খোঁজে এই অজপাড়াগাঁয়ে দূরাগত রোগীদের পুরনো কাৎড়ানো শুনা যাবে কেন ! বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মরে যাবার আগেও মৃত্যুপথযাত্রী এই সব রোগীরা তাবিজের অলৌকিক গুণে এতটুকু অবিশ্বাস বা অশ্রদ্ধা তো দেখায়ই না, বরং কুদরতি তাবিজের শর্ত না মানার দোষে নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করতে করতেই এরা পরপারের মিছিলে দিব্যি সামিল হয়ে যায় ! এইসব গরম খবর কিছুদিন পরই ঠাণ্ডা হয়ে চাপাও পড়ে যায় দ্রুত।

কেউ কেউ বলেন, ভৃঙ্গু কোবরেজের মতো তাঁর তেলেসমাতি তাবিজের কার্যপ্রণালী বুঝি আরো বেশি রহস্যাবৃত। তা জানতে হলে প্রকৃতই জটিল কোন রোগী হয়ে তাঁর কাছে হন্যি দেয়া ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা আছে কিনা জানা নেই। কেননা কাক-পক্ষিরও অগোচরে রাখা তাবিজের অবশ্য পালনীয় গুপ্ত শর্তটি শেষপর্যন্ত রোগীর সাথেই স্বর্গ কিংবা জান্নাতবাসী হয়ে গেলে ইহলোক থেকে সংযোগরক্ষার প্রচেষ্টায় কাউকে আর আগ্রহী হতে দেখা যায় না। আর নিতান্তই আরোগ্যবাসী কোন রোগী আরোগ্যকালের দীর্ঘস্থায়ীত্বের জন্য মরে গেলেও গুপ্তকথা ফাঁস না করার শর্ত ভেঙে ঝুঁকি নেবার নজির স্থাপন করেছে এমনটাও এযাবৎ দেখা যায় নি।

তবু কিছু কিছু কাহিনী যেভাবে নিজস্ব শক্তিমত্তা বা কৌতুকের উৎস হয়ে আকাশে বাতাসে কিছুকাল ছড়িয়ে থাকে, তা কি কারো কৌতুহলসৃষ্ট গুজব, না কি লিক হয়ে বেরিয়ে আসা কোন গুপ্তকথা, এর সত্যাসত্য নির্ণয় করার উপায় কারোরই থাকে না। কেননা পড়শিগঞ্জের বিদেহী রোগীটি সব কূল সেরে শেষচেষ্টা হিসেবে প্রথম যেদিন ভৃঙ্গু কোবরেজের ডেরায় এসে হামলে পড়েছিলো, কোবরেজ তাকে সত্যি সত্যি সর্বোচ্চ হাদিয়ার বিনিময়ে এক হপ্তায় সম্পূর্ণ আরোগ্য হবার একশতভাগ গ্যারান্টিসহ সর্বরোগহরা তেলেসমাতি তাবিজটি হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো দ্রুত। শর্ত অনুযায়ী অক্ষরে অক্ষরে প্রতি প্রত্যুষ আর প্রদোষের ব্রাহ্মমুহূর্তে কাঁসার গেলাসে তাবিজের তিনচুবা পানি একনিঃশ্বাসে পান করে গেছে ঠিকই। কিন্তু তাগুদে পানি পান করার সময় কিছুতেই কোন ইতর বানরের কথা মনে না আনার পুনঃপুন সতর্কবাণী নিজের দোষেই চাপা পড়ে গেলো গেলাস হাতে নিয়েই। চোখের সামনে শুধু বানর আর বানরের ছবিই ভাসতে থাকলো। কিছুক্ষণ চুল ছিঁড়ে, কিছুক্ষণ নিজের বাপান্ত শাপান্ত করতে করতে রোগী বাবাজী দ্বিতীয়বার কোবরেজ পর্যন্ত আর পৌঁছতে পারলো না। পথেই মরে রইলো। এ খবর আস্তানায় এসে পৌঁছালে তাবিজের এমন জীবন্ত ক্ষমতার প্রমাণ হাতেনাতে পেয়ে তাবিজের প্রতি অপেক্ষমান রোগীদের আস্থা আরো বহুগুণ বেড়ে গেলো।

এসব তো বহু আগেকার কথা ! তাবিজের জীবন্ত তেজ তো চোখের সামনেই অনেকে দেখেছে ! এক্কেবারে নিজের ঘরে হলে কী হবে, তাবিজ অমান্য করায় কোবরেজের বড় ছেলেটি রাতের খাবারটাও শেষ করতে পারলো না, মাথা ঘুরে পড়ে আবোল-তাবোল বকতে লাগলো। এক্কেবারে উন্মাদ দশায় খুঁটির সাথে বেঁধে রেখেও শেষপর্যন্ত সারানো গেলো না। ভাগ্যিস কোবরেজ তাঁর গুণীন মন্ত্র দিয়ে ঠিকই ধরে ফেলেছিলো, বৌ’টি যে ভয়ঙ্কর একটা উপরি আছর নিয়ে কোবরেজ বাড়িতে ঢুকেছিলো। যে কিনা দেশগ্রামে অন্যের আলগা-আছড় আর কু-প্রভাব সারিয়ে বেড়ায়, তার ঘরেই হানা ! সাংঘাতিক ব্যাপার ! এটা যে গোটা গ্রামের জন্যই ঘোর অমঙ্গল !

অতঃপর রাত-বিরেতে বৌটির আর্ত চিৎকারে আশেপাশের সবাই আশ্বস্ত হতে শুরু করলো যে, কোবরেজের গুণীন শক্তির কাছে অপশক্তিটি ধীরে ধীরে নিরস্ত হচ্ছে। দিনের পর দিন এই অতিলৌকিক শক্তি-লড়াই শেষে কু-আছরটিকে গ্রামছাড়া করা হলো ঠিকই, তবে যাবার আগে সে কোবরেজের বড় ক্ষতিটি করে গেলো। ভোর রাতে দেখা গেলো বৌটি পেছনের গাব গাছে ঝুলে আছে অনেকটা উদোম হয়ে। গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়লো কোবরেজ বাড়িতে। অবাক বিস্ময়ে সবাই দেখলো, অপশক্তির আছর কিভাবে একটি তন্বী নারীর নরম শরীর নির্বিচার ফালাফালা করে দিয়ে যায় ! মেয়ের মতো লক্ষ্মী বৌটির এহেন দুর্দশায় বিমর্ষ কোবরেজের মুখে বহুদিন স্থিরতা দেখেনি কেউ। পালিত কন্যাটি সেবা শুশ্রূষা করার মতো ডাঙর হয়ে ওঠলে বহুদিন পর কোবরেজের মুখে হাসি ফিরে আসে।

অচিনপুর গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনে এসব ঘটনার ঢেউ মাঝে মাঝে একঘেয়েমীর পাথরটাকে একটু আধটু নাড়া দিয়ে যায় বলেই জীবনটা এখনো বহমান তাদের কাছে। একেকটি ঘটনার লবণ তাদের পানসে জিহ্বায় অনেকদিন ধরে যে নোনা স্বাদটুকু ধরে রাখে তার একমাত্র উৎস ওই কোবরেজ বাড়িটাতে আবার একদিন গ্রামের লোক ভেঙে পড়লো। বহু রহস্যের জন্মদাতা ভৃঙ্গু কোবরেজই এবার আজব এক অচেনা রোগের শিকার !

সেই যে পিতৃপরিচয়হীন পালিত কন্যাটি, যে কিনা ফি বছর মৃত সন্তান বিয়ানোতে কখনোই ক্ষান্ত দেয়নি, কখন যে কোবরেজের সমস্ত গুণীনবিদ্যা আয়ত্ত করে নিয়েছে কেউ খেয়ালও করে নি ! খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা ভাঙাচোরা চেহারার ভৃঙ্গু কোবরেজকে অচেনা অপশক্তিটি যে সত্যি সত্যি কাবু করে ফেলেছে, তা তাঁর ঝুলে পড়া চেহারা দেখেই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। পাশেই চেলাকাঠ হাতে দাঁড়ানো কোবরেজের অপ্রকৃতিস্থ ছোট ছেলেটি কার চিকিৎসায় হঠাৎ সুস্থ হয়ে ওঠেছে তা নিশ্চিৎ হওয়া না গেলেও ভৃঙ্গু কোবরেজকে সারিয়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টায় মেয়েটির কোন খামতি দেখা গেলো না।
তাঁর মুখের কাছে পানি ভর্তি গেলাসটি ঠেলে দিয়ে চিৎকার করে বলছে সে- বল্, এই তাবিজের পানি খাবার সময় কার চেহারা মনে আনা যাবে না, বল ?
বজ্রপাতের তীব্রতায় ঝলসে যাওয়া বৃক্ষের ভেঙে পড়া শব্দের মতো কোবরেজের কণ্ঠ ভেঙে মড়মড় আওয়াজ বেরিয়ে এলো- ‘...মেয়েমানুষের চেহারা !’
(১০/০৫/২০০৯)
Image: 'apilogue' from internet.

[sachalayatan]
[khabor.com]
[mukto-mona]
[sa7rong]

Wednesday, April 22, 2009

# [অনুগল্প] --- এই রিমি, দাঁড়া...!


এই রিমি, দাঁড়া...!
রণদীপম বসু

ধাম করে জড়িয়ে ধরলো সে। এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই নরোম ঠোঁট দুটো সজোরে চেপে ধরলো আমার খসখসে গালে। একটা মৌ মৌ গন্ধে কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলো। যখন বুঝতে শুরু করলাম একটি সদ্য তরুণী-দেহ তার সমগ্র সত্তা দিয়ে অক্টোপাশ-বন্ধনে আমাকে আস্টেপৃষ্ঠে পিশে ফেলতে চাইছে, কী যেন হয়ে গেলো আমার ! এই প্রথম টের পেলাম, শক্ত-সমত্থ তরুণ শরীরটাতে বুঝি মনের আড়ালে মিশে লুকিয়ে ছিলো একটা বেয়াড়া পুরুষও ! কিন্তু তার আগেই ঝট করে ছেড়ে দিয়ে দু’পা পিছিয়ে দাঁড়ালো সে, জোড়া দীঘির মতো টলটলে চোখ দুটো মেলে কীরকম চেয়ে রইলো আমার দিকে ! চিকচিক করলো কি ? আচমকা ঘুরেই দৌড়াতে লাগলো !
আরে আরে করে কী ! কেবল তো এলো ! এখনই চলে যাচ্ছে কেন ! ওর সাথে আর কি দেখা হবে আমার ! কণ্ঠ চিরে অজান্তেই বেরিয়ে এলো- এই রিমি, দাঁড়া...!
ধাবমান ডাকে কোনো সাড়াই দিলো না সে। কোমরের কাছে নেমে আসা মোটা কালো বেণীটা রিমি’র পিঠ জুড়ে লাফাচ্ছে তখন...।

গোটা গ্রামে শেষপর্যন্ত রিমি’রাই একঘর হিন্দু। বরাবরের মতো দরদী করিম চাচা বাদে আর কেউ জানে না যে আজ রাতে ওরাও এ দেশের পাট চুকিয়ে চলে যাচ্ছে। কাল বাদে পরশু অনার্স সেকেন্ড পার্ট পরীক্ষা আমার। রিমির কাছ থেকে খবরটা পেয়েই পরীক্ষা মাথায় ওঠেছে। সবকিছুই ওলটপালট হয়ে গেছে তখন। রিমিকে আর কখনোই দেখবো না এটা কী করে সম্ভব ! উন্মত্তের মতো চলন্ত বাসের হ্যান্ডেলে ঝুলে পড়াটাই শেষ ঝুলা হতো কিনা কে জানে, বাসের হেলপার কন্ডাক্টর ড্রাইভার এমনকি যাত্রীরাও দমে-বেদমে কত কী যে বকে গেছে। কিন্তু আমার মাথা জুড়ে একটাই ভাবনা- রিমি, তোকে কোথাও যেতে দেবো না আমি !

দীঘির পাড় ছেড়ে গাছ-গাছালি পেরিয়ে বাঁশঝাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া আকাবাঁকা রাস্তাটার সাথে রিমি’র ছুটন্ত নদীমাখা শরীরটাও হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। সত্যি কি রিমি হারিয়ে যাবে ! ভেতরে কোথায় কী যেনো থরথর করে কেঁপে ওঠলো আমার। তা কী করে সম্ভব ! কিছুতেই তা হবার নয় ! চোখের আড়ালে যাবার আগেই ওকে ধরতে হবে। না রিমি, কোথাও যেতে দেবো না তোকে ! এক অচেনা ক্ষিপ্রতা এসে ভর করলো, তীব্র বেগে ছুটিয়ে নিলো আমাকে। ওই তো রিমি ! বাঁশঝাড়টা পেরোবার আগেই দড়াম করে কী যেনো লাগলো এসে মাথায় ! মুহূর্তেই সবকিছু অন্ধকার... ... ...।


...গভীর কোন নৈঃশব্দ থেকে অস্পষ্ট গুঞ্জনটা ক্রমেই জোরালো হতে হতে একটা অসহ্য হট্টগোলে পরিণত হলো। কিসের এতো হৈহুল্লোড় ? চোখ দুটো খুলেছি কিনা বুঝতে পারছি না, সবকিছু ফকফকে সাদা ! বারকয়েক পিট পিট করতেই কুয়াশার পর্দাটা ধীরে ধীরে সরে গেলো। মাথার উপর ভনভন করে ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানটাকে বড়সড় অস্পষ্ট থালার মতো লাগছে। কিন্তু কোথায় আমি ? বুঝা গেলো চিৎ হয়ে শুয়ে আছি। এদিক ওদিক তাকিয়ে হাসপাতালের কোন কেবিনের মতো মনে হলো। পর্দার ওপাশে মানুষের একটানা গুঞ্জন। কিন্তু আমি এখানে কেন ? কী হয়েছে আমার ? ওঠে বসতে গিয়েও বসতে পারলাম না। ঝনঝন ধাতব শব্দ আর শরীর জুড়ে তীব্র ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠলাম। হাত-পাগুলো শেকলবদ্ধ করা ! মানে...!!

হঠাৎ পাশে কোথাও থেকে তীব্র চিৎকারে কেঁপে ওঠলাম ! ঠা ঠা শব্দে কারো অট্টহাসিও শোনা গেলো। একটা মৌ মৌ গন্ধ নাকে এলো। হঠাৎ থরথর করে কাঁপতে লাগলো শরীর ! মনে পড়ে যাচ্ছে সব- এটা তো রিমি’র শরীরের ঘ্রাণ ! আমার রিমি কোথায় ? ওকে আমি কোথাও যেতে দেবো না !
টান পড়ে শেকলগুলো ঝনঝন করে ওঠলো আবার। স্টেথো ঝুলানো গলায় পর্দা সরিয়ে কে যেন উঁকি দিলো। চেঁচিয়ে ওঠলাম- ডাক্তার ডাক্তার...প্লীজ ! আমাকে রিমি’র কাছে যেতে দিন...প্লীজ !
’নার্স’ ! অপসৃত ডাক্তারের বদলে পর্দা সরিয়ে স্থূলদেহী অদ্ভুত-দর্শনা নার্সটি একটা সিরিঞ্জ হাতে আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকলো...।
প্লীজ সিস্টার...প্লীজ, আমাকে একটিবার রিমির কাছে যেতে দিন...ওকে আমি কোথাও যেতে দেবো না...! শেকলবদ্ধ হাতে-পায়ে শরীরটাকে সমস্ত শক্তি দিয়ে মোচড় দিলাম। কোনো লাভ হলো না। তীব্র ভূকম্পনের মতো একটা অনিঃশেষ কান্নার ঢেউ ছটফট করা বুকের খুব গভীর থেকে প্রলয়বেগে উঠে আসতে লাগলো...।
’হুঁহ্, দেশে মাইয়ার অভাব আছে ! হেই কবে মইরা ভুত হইয়া গেছে !’ গজগজ করতে করতে নার্সটি সাঁই করে সিরিঞ্জের সুঁই’টা আমার নিতম্বের পাশে ঢুকিয়ে দিলো...।
(২১/০৪/২০০৯)

[sachalayatan]
[khabor.com]