Showing posts with label Article (Literature). Show all posts
Showing posts with label Article (Literature). Show all posts

Friday, August 14, 2009

| …সাহিত্যের দিনমজুর !


…সাহিত্যের দিনমজুর !
রণদীপম বসু
.
(০১)
‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে…’, রবীন্দ্রনাথের এই সঙ্গীতটিকে ঋদ্ধি ও মননে ধারণ করেছিলেন বললে হয়তো ভুলভাবে বলা হবে ; বলতে হবে, ওই সঙ্গীতের মন্থিত জীবন-রসের সবটুকু মাধুর্যকেই বুকে আগলে নিয়েছিলেন তিনি। শুধু কি আগলেই নিয়েছিলেন ? আগুনের ওই পরশমণির অনিন্দ্য ছোঁয়ায় অগ্নিশুদ্ধ হয়ে নিজেকে এমন এক জীবনশিল্পীর মর্যাদায় আলোকিত করে নেন, সমকালীন বাস্তবতায় কী সাহিত্যে কী সাংবাদিকতায় কী চিন্তা চেতনা জীবনাচারে সময়ের চেয়েও এক অগ্রবর্তী পুরুষে উত্তীর্ণ হন তিনি। আর সময়ের চেয়ে এগিয়ে গেলে যা হয়, চলনে বলনে যাপনে সহজ সারল্যের প্রকাশ সত্ত্বেও সাধারণের চোখে হয়ে যান দুর্নিবার বিস্ময়, জিজ্ঞাসায় মোড়ানো এক রহস্য পুরুষ ! মাহবুব-উল আলম ছিলেনও তা-ই।

ধন্দে পড়তে হয় তাঁর নামের আগে প্রয়োগযোগ্য একক কোনো বিশেষণের খোঁজে। কথাশিল্পী ? হতেই পারে। সাহিত্যে মৌলিক চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির জন্য যিনি সর্বোচ্চ পুরস্কার হিসেবে ১৯৬৫ সালে ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’, ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দেয়া পুরস্কার ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ এবং ১৯৭৮ সালে ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হন, ‘কথাসাহিত্যিক’ বিশেষণটা যে তাঁর একান্ত নিজস্ব শব্দমালার অংশ হয়ে যায়, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে ! প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ার কর্তৃক আমন্ত্রিত লেখক হিসেবে আমেরিকা সফরে (১৯৫৯ সালে) পাওয়া ‘He is a man of unusual talent’ অভিধা যাঁর স্বীকৃতিপত্রে ঝলমল করতে থাকে, বিশেষণ নিজেও হয়তো বিশেষায়িত হয়ে যায় মাহবুব-উল আলম নামটির সাথে একাত্ম হতে পেরে।

মাত্র উনিশ বছর বয়সে প্রথম মহাযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় রচিত ‘পল্টনজীবনের স্মৃতি’ (১৯৪০), ‘বর্মার হাঙ্গামা’ (১৯৪০), সাড়া জাগানো আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘মোমেনের জবানবন্দী’ এবং ‘পঞ্চ অন্ন’ (১৯৪৬), সমকালীনতা উত্তীর্ণ আধুনিক শিল্পকর্ম রূপে স্বীকৃত ও সমাদৃত উপন্যাসিকা ‘মফিজন’, হাস্য-রসাত্মক গল্প সংকলন ‘গোঁফ সন্দেশ’ (১৯৫৩) সহ ৩৪টিরও অধিক গ্রন্থ সেই সাক্ষ্যই বহন করে। তাঁর ‘মোমেনের জবানবন্দী’ গ্রন্থটি ইংরেজী ও উর্দুতে অনুদিত হয় তখনই। ইংরেজীতে অনুবাদ করেন অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্ত্রী শ্রীমতি লীলা রায় ‘Confessions of a Believer’ নামে (১৯৪৬)। অসাধারণ জীবনদৃষ্টি সম্পন্ন এই বইটি তৎকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায়ও অন্তর্ভূক্ত হয়। তিনটি ভ্রমণ কাহিনী ইন্দোনেশিয়া (১৯৫৯), তুর্কী (১৯৬০) ও সৌদী আরব (১৯৬০) ছাড়াও তাঁর মরণোত্তর প্রকাশিত হাস্য-রসাত্মক গল্প সংকলন ‘প্রধান অতিথি ও তাজা শিংগী মাছের ঝোল’, ‘রঙবেরঙ’, ‘পল্টনে’ এবং ‘সাত সতেরো’ সে সময়ে পাঠক মহলে যথেষ্ট সাড়া জাগায়। অন্নদাশঙ্কর রায়ের সাথে দীর্ঘদিনের পত্রালাপের প্রেক্ষিতে বাংলা সাহিত্য ঋদ্ধ হয় আরো দুটো পত্র-সাহিত্য গ্রন্থ পেয়ে- ‘আলাপ’ ও ‘আলাপ: নবপর্যায়’।

কথাসাহিত্য চর্চার পাশাপাশি অত্যন্ত মননশীল ও শ্রমসাধ্য ইতিহাস রচনায় নিজেকে ব্রতী রেখেছেন এমন নজির বাংলা সাহিত্যে খুব একটা চোখে পড়ে না আমাদের। অথচ কী বিস্ময়করভাবে দেখি অভূতপূর্ব প্রকরণ, প্রক্রিয়া ও উপকরণ মিশিয়ে তিন খণ্ডে চট্টগ্রামের ইতিহাসের এক সমৃদ্ধ জগতের উপহার তুলে ধরেন পাঠকের হাতে- পুরানা আমল, নবাবী আমল ও কোম্পানী আমল নামে। আরো বিস্ময় অপেক্ষা করে জীবদ্দশায় সর্বশেষ যে দুঃসাধ্য কাজটি করে গেলেন তিনি, তা দেখে ! সাত বছরের একাগ্র সাধনা ও একক প্রচেষ্টায় সর্বাধিক তথ্যসমৃদ্ধ চার খণ্ডে রচিত ১২০০ পৃষ্ঠার বাঙ্গালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত, যার অসামান্য শিরোনাম- ‘রক্ত আগুন অশ্রুজল: স্বাধীনতা’। অশ্রু যখন কাব্যিক ব্যাপ্তি নিয়ে অশ্রুজল হয়ে ওঠে, এর নৈর্ব্যক্তিক গভীরতা স্বাধীনতা শব্দটির সাথেই শুধু মাখামাখি হয় না, স্বাধীনতার বোধটিও কেমন যেন বেদনাসিক্ত হয়ে ওঠে আমাদের বুকের কোণে। ভাবতেই অবাক লাগে, যে বয়সে একজন ব্যক্তি-মানুষ ব্যবহারিক জীবন থেকে নিজকে বিশ্লিষ্ট করে অসহায় সীমাবদ্ধতায় আটকে নিজেকে গুণ্ঠিত করে নেয় আত্মজৈবনিক স্মৃতিমত্ততায়, সেই বয়সে এসে কী করে একজন মাহবুব-উল আলম গোটা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়টাতে হেঁটে হেঁটে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য কুড়িয়ে এতো বিশাল ইতিহাস গ্রন্থের কাঁচামাল সংগ্রহ করেন ! ভাবতেই গা শিহড়ে ওঠে ! নামের পাশে একটা ‘ইতিহাসবিদ’ বিশেষণ ধারণ করতেও এতো বিশাল কর্মকুশল আয়োজনের প্রয়োজন পড়ে কি ! কিন্তু তাঁর তো ইতিহাসবিদ বিশেষণের চাওয়া ছিলো না। দরকার ছিলো আগুনের পরশমণির ছোঁয়ায় ভেতরে ধারণ করা ব্যক্তিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উন্মুক্ত জানালা দিয়ে যত কঠিনই হোক সত্য আর সুন্দরের সুবাতাস বইয়ে দিয়ে এই জনগোষ্ঠিকে ইতিহাসমনস্ক করে তোলা। কতোটা যোগ্যতা, সামর্থ আর নিজের উপর কঠিন আত্মবিশ্বাস থাকলে এরকম একক ও বিশাল একটা কাজের পরতে পরতে আন্তরিক কুশলতা ছুঁয়ে থাকে, তা বিস্ময়কর বৈ কি !

প্রজাতন্ত্রের চাকুরি থেকে অবসর নিয়েই ১৯৫৩ সালে মাহবুব-উল আলম ‘জমানা’ নামে চট্টগ্রামের প্রাচীনতম যে সাপ্তাহিক পত্রিকাটি বের করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে তা ‘দৈনিক জমানা’য় রূপান্তর ও প্রতিষ্ঠিত করেন, এর মধ্য দিয়ে তিনি যে শুধু নিজেকে সাংবাদিকতায় নিয়োজিত করেন তাই নয়, সম্পাদকীয় বিষয় নির্বাচন ও রচনারীতিতে স্বাতন্ত্র্যের জন্য সাংবাদিকতায়ও রীতিমতো পথিকৃতের মর্যাদা লাভ করেন।

জীবনকে ভেতর থেকে কৌতুকময় দৃষ্টিতে দেখা এবং চতুর্মাত্রিক দৃষ্টিকোণে গভীর উপলব্ধির মধ্য দিয়ে তাকে যাচাই বাছাই করার বিশ্লেষণধর্মী সারস্বত ক্ষমতা সবাই পায় না। কাউকে কাউকে তা অর্জন করতে হয় প্রচুর অধ্যয়ন অধ্যবসায় আর অগ্নিশুদ্ধ জীবনবোধ দিয়ে। মাহবুব-উল আলম তাঁদেরই একজন। পরম হংসের মতো জীবনের সারটুকু ছেঁকে নিয়ে নিজের জন্য জমিয়ে রাখেন নি তা, আমাদের সাহিত্য পাতে ঢেলে দিয়েছেন শিল্পমমত্ব দিয়ে। নিজেকে এই সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির বাইরের কেউ ভাবেন নি বা মানুষ ও সমাজের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত দায়বদ্ধতাকেও গোপন করেন নি কখনো। তাই হয়তো তাঁর সহজাত কৌতুকময়তা দিয়ে নিজেকে সাহিত্যের একজন দিনমজুর হিসেবে আখ্যায়িত করতে একটুও কুণ্ঠাবোধ না করেই নির্দ্বিধায় বলে ফেলেন- ‘… আমি সাহিত্যের দিনমজুর !’ এখানেই তাঁর দায়বোধ কড়ায়গণ্ডায় উশুল করে দিয়ে যান তিনি। কিন্তু উত্তর প্রজন্ম হিসেবে আমরা কি তাঁর চর্চা করছি ? চাইলেও তাঁর সেই আলোচিত বইগুলো এখন কোথাও পাওয়া যায় না। এবং যতটুকু জানি তাঁর কোন রচনা-সমগ্রও প্রকাশিত হয় নি আজতক। আমাদের এই লজ্জাজনক সীমাবদ্ধতাকে আর কতোকাল অক্ষম পরিতাপ দিয়ে ঢেকে রাখবো আমরা ?

আমাদের সাহিত্যপাড়ায় বহু অঘা-মঘাকে নিয়েও আলোচনা হতে দেখা যায় বিস্তর। কিন্তু কী আশ্চর্য, মাহবুব-উল আলম’কে নিয়ে কোন আলোচনা আদৌ কি হয় ? তাহলে বর্তমান প্রজন্ম তাঁর সম্পর্কে জানবে কোত্থেকে ? যাঁর মেধা ও কাজের তুলনায় বহুগুণে তুচ্ছ ও নগন্য কাজ দিয়েও একালের সাহিত্যপাড়ায় রীতিমতো আলোচিত হয়ে ওঠা কোনো বিষয়ই নয়, সেখানে নতুন প্রজন্ম এ সম্পর্কে কিছুই জানে না যে, আমাদের এমন একজন মাহবুব-উল আলম ছিলেন যিনি তাঁর মননশীলতার অনেক বড় ও ঈর্ষণীয় স্বীকৃতি পেয়েও নিজেকে সাহিত্যের একজন দিনমজুর পরিচয় দিতেই ভালোবাসতেন। ব্যক্তি ও কর্মযজ্ঞে কী ছিলেন তিনি- তা জানার দায়বোধ উত্তর প্রজন্ম হিসেবে আমাদের মধ্যে যদি সঞ্চারিত না হয়, এবং তা অর্জনেও যদি অক্ষম হয়ে পড়ি, এই দায়-দায়িত্ব কি এড়াতে পারবো আমরা ? কেননা, আমাদের পরেও আরো প্রজন্ম আসবে এবং আসতেই থাকবে।

(০২)
৭ আগষ্ট ২০০৯, শুক্রবার। নির্ধারিত সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা পেরিয়ে গেছে। ৩২, তোপখানা রোডের চট্টগ্রাম ভবনের নয় তলার তাপানুকুল হলরুমে যখন ঢুকলাম ততক্ষণে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। কথাশিল্পী সাংবাদিক ইতিহাসবিদ মাহবুব-উল আলম-এর ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানমঞ্চ আলোকিত করে বসে আছেন ডান থেকে ড.রফিকুল ইসলাম, ড.মাহমুদ শাহ কোরেশি, সভাপতি সবিহ-উল আলম, ড.আনিসুজ্জামান ও ড.মনিরুজ্জামান। দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে পরিচিত-অপরিচিত বহু মুখ। তবে এরা প্রায় সবাই যে সাহিত্যপাড়া সংশ্লিষ্ট, তা বলার বাকি রাখে না। একে একে আলোচনা করলেন অনেকেই। মঞ্চে উপবিষ্টরা ছাড়াও দর্শক সারি থেকে রণজিৎ বিশ্বাস, সুব্রত বড়ুয়া, ড.মনসুর মুসা, আলী ইমাম প্রমুখরা মাহবুব-উল আলমের জীবন ও কর্মমুখরতা নিয়ে স্মৃতিচারণ আর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পাতাগুলো উল্টেপাল্টে সন্ধ্যাটাকেই সার্থক করে দিলেন বলা যায়।


তাঁকে নিয়ে কৌতুহল আমার দীর্ঘদিনের। কিন্তু প্রয়োজনীয় রচনাবলী বা প্রতিনিধিত্বশীল গ্রন্থের অভাববোধ এই কৌতুহল নিবৃত্তির কোন সুযোগ দেয় নি বলে চাপা পড়ে ছিলো। হঠাৎ করে মাসিক শিশু-কিশোর পত্রিকা ‘টইটম্বুর’-এর আমন্ত্রণপত্রটি পেয়ে সে সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। মাহবুব-উল আলমের জোটবদ্ধ বংশধারা চট্টগ্রামের বিখ্যাত সেই আলম পরিবারই মূলত সতের বছর ধরে টইটম্বুর পত্রিকাটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে শিশু-সাহিত্যের একটা ক্লাসিক ধারা জিইয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এবং কালে কালে এর লেখক পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে বৃহৎ পরিসরে একটা টইটম্বুর পরিবারই গড়ে উঠেছে বলা যায়। তাদের সাগ্রহ প্রশ্রয়ে মাঝেমধ্যে দুয়েকটা লেখালেখির সূত্র ধরে নিজেকেও আমি কখন যে এই টইটম্বুর পরিবারের অবাধ্য একজন হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলাম জানি না। তাই মাহবুব-উল আলম সম্পর্কে আমার জানার পরিধিটা যে প্রায় না-জানার পর্যায়ে ছিলো তা টের পেলাম এ অনুষ্ঠানে এসে।

চট্টগ্রামের ফতেহাবাদ গ্রামে ১লা মে ১৮৯৮ সালে জন্ম আর ৭ই আগষ্ট ১৯৮১ মালে কাজির দেউড়ীস্থ নিজ বাসভবনে মৃত্যু, ৮৩ বছরের এই ক্ষণজন্মা পুরুষ মাহবুব-উল আলম ছিলেন পিতা মৌলভী নসিহউদ্দিন সাহেবের দ্বিতীয় পুত্র। তাঁর অন্য ভাইরা হচ্ছেন শামসুল আলম, দিদার-উল আলম ও ওহীদুল আলম। মৌলভীর পুত্র খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মৌলভী না হয়ে যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফতেয়াবাদ মিডল ইংলিশ স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে তৎকালীন দেশসেরা কলেজ চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়ে কিছুকাল লেখাপড়া করেন, তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় এটা একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় বৈ কি। তাঁর কোন ভাই-ই মৌলভী হন নি। চট্টগ্রাম কলেজের পড়ালেখা চলছিলো ভালোই। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে মনোযোগ চলে গেলো যুদ্ধের ময়দানে। যাকে বলা হতো পল্টন। ১৯১৭ সালে উনিশের সে তারুণ্য তাঁকে নিয়ে গেলো সেখানেই। যুদ্ধ করতে করতে চলে গেলেন মেসোপটোমিয়া। ১৯১৯-এ সেখান থেকে ফিরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দৌঁড়ে সহপাঠিদের থেকে পিছিয়ে পড়া অত্যন্ত মেধাবী মাহবুব-উল আলমের শিক্ষাজীবনে আর ফেরা হলো না। সোজা কর্মজীবনেই ঢুকে গেলেন। প্রজাতন্ত্রের সাব-রেজিস্টার থেকে কর্ম পরিক্রমায় হলেন ডিস্ট্রিক্ট সাব-রেজিস্টার। তারপর ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্টার এবং সবশেষে ইন্সপেক্টর অব রেজিস্ট্রেশন।

৩৪ বছরের চাকুরিকালেই ফাঁকেফোকে লেখালেখির চর্চা আর অবসর গ্রহণ করে লেখা ও প্রকাশনায় পুরোপুরি জড়িয়ে যাওয়া এ মানুষটির স্চ্ছলতায় কোন ঘাটতি ছিলো না। কিন্তু কাজির দেউড়ী থেকে বেরিয়ে রোজ হেঁটে হেঁটে শহরময় ঘুরে বেড়ানো এ মানুষটিকে কখনো রিক্সায় চড়তে দেখেছেন কিনা, প্রত্যক্ষদর্শী কেউ তা মনে করতে পারলেন না। এক বগলে কতকগুলো বই আর অন্য হাতে ছাতা ধরে চিরকালীন সাদা টুপি পরিহিত এই মানুষটি গোটা চট্রগ্রামবাসীর চোখে এমনই এক আর্কিটাইপ ব্যক্তিত্বের প্রতীকে পরিণত হয়ে গেলেন যে, এর বাইরে তাঁর অন্য কোন প্রতিকৃতি থাকতে পারে তা যেন একেবারে অকল্পনীয় ছিলো। কখনো টাউন বাসের ভীড়ের মধ্যে গুটিশুটি মেরে বসে থাকা সেই বই-বগলে মানুষটি এভাবেই বুঝি অত্যন্ত সঙ্গত ও স্বাভাবিক। বক্তাদের স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে কল্পনায় আমিও যেন স্পষ্ট দেখছিলাম তাঁকে। বাসের টিকেট, হ্যান্ডবিল কিংবা হাতে নেয়া কোন ঠোঙ্গা ইত্যাদি বিভিন্ন আকার আকৃতি আর ঢঙের উদ্ভট সব কাগজের ফাঁকা পিঠে গুটগুট অক্ষরে লিখে ফেলা কথাগুলোই যখন অবিকৃতভাবে একত্র গ্রন্থিত হয়ে কোন মহার্ঘ রচনার অদ্ভুত পাণ্ডুলিপির চেহারা পেতো, তা হাতে পেয়ে প্রকাশকদের যেরকম আক্কেলগুড়ুম চেহারা হতো, কল্পনায় আমি ঠিকই দেখতে পাচ্ছি যেন। স্রষ্টারা নাকি এরকম খেয়ালিই থাকেন। একেকজনের খেয়াল হয়তো একেকরকম। কিন্তু মাহবুব-উল আলমের মতো এমন বিচিত্র খেয়াল আর কোন লেখকের কোথাও কোনকালে ছিলো কিনা ড. আনিসুজ্জামানও তা বলতে পারলেন না।

এরকম বহু স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গেলো সেদিন চট্টগ্রাম ভবনের নবম তলার হলরুমটিতে। আমার জন্য তা খুবই আকর্ষণীয় ছিলো। তাই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে এলেও কথাশিল্পী মাহবুব-উল আলমের সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ পুত্র সবিহ-উল আলম, যিনি দীর্ঘদিন পিতার সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁর কথাটা তখনও বুকের ভেতর অনুরণিত হচ্ছিল- ‘আমার জীবনশিল্পী বাবা বলতেন, তিনটা বিষয় মেনে চলার চেষ্টা করো। এক, বছরে একবার হলেও সমুদ্রের কাছে যাবে ; সমুদ্রের বিশালতার পাশে নিজের ক্ষুদ্রত্ব ও নগন্যতাকে উপলব্ধি করে নিজেকে চিনতে পারবে। দুই, সম্ভব হলে বছরে একবারের জন্য সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টার চূড়ায় উঠবে ; উপর থেকে নিচের ছোট-বড় ভেদাভেদগুলো মুছে কিভাবে সবকিছু সমান হয়ে যায় তা শিখবে। তিন, বছরে অন্তত একটা রাত পূর্ণ জ্যোৎস্নায় কাটাবে ; সূর্যালোকের প্রখর তীব্রতার বিপরীতে চাঁদনির মোহনীয় স্নিগ্ধতায় মানবিক সৌন্দর্যবোধের পরিচর্যা হবে।

ব্যাখ্যার চেয়ে কথাগুলোর উপলব্ধিজাত অনুভবই বুকের মধ্যে একটা স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিলো। লিফট থেকে বেরিয়ে যখন রাস্তায় নামলাম, খুব ইচ্ছে হলো, আহা, আমিও যদি সাহিত্যের নগন্যতম কোন এক দিনমজুর হতে পারতাম…!

তথ্যসূত্র:
০১) মাহবুব-উল আলম কেন প্রাসঙ্গিক/ রণজিৎ বিশ্বাস।
০২) আজ কথাশিল্পী মাহবুব-উল আলম-এর ২৮তম মৃত্যু বার্ষিকী/ অনুষ্ঠান আয়োজনা।


.
[sachalayatan]
[mukto-mona blog]
[somewherein|alternative]

Thursday, March 26, 2009

# চিত্রকল্পে কিশোর-কবিতার স্বরূপ অন্বেষণ...


চিত্রকল্পে কিশোর-কবিতার স্বরূপ অন্বেষণ...
রণদীপম বসু

‘সেই লেখা লেখা নয় নাহি যার রস।’ কবি ঈশ্বর গুপ্তের এই রায়কে মান্য করলে আমাদের স্বীকার করে নিতে হয় যে, রস সৃষ্টিই সাহিত্যের অভীষ্ট লক্ষ্য। তাহলে প্রশ্ন আসে রস কী ? টস টস করে ঝরে পড়ার মতো কোন নিঃসৃত তরল পদার্থ যে নয় তা তো আমরা বুঝতেই পারছি। এ হচ্ছে সাহিত্যের রস। আর কাব্য বিচারে এলে কাব্যরস। তবে রস প্রসঙ্গে জানতে হলে আমাদেরকে তো রসশাস্ত্রে ঢু মারতেই হয় !

প্রাচ্য-অলঙ্কার শাস্ত্রে রস একটি পারিভাষিক শব্দ। যার ধাতুগত মূল অর্থ হচ্ছে আস্বাদন করা। কাব্যতত্ত্বের প্রধান পুরুষ আচার্য ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে নাকি ঘোষণা করেছেন এই বলে যে, “-নহি রসাদ ঋতে কশ্চিদর্থঃ প্রবর্ততে।” (নাট্যশাস্ত্র, -৬/৩৪) অর্থাৎ রস ব্যতিরেকে কোন বিষয়েরই প্রবর্তনা (সূচনা) হয় না। রসের এই সর্বব্যাপী-সর্বগ্রাহী স্বরূপ উপলব্ধি করেই রসের সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ে আত্ম-জিজ্ঞাসায় প্রশ্ন রাখেন- “অত্রাহ, রস ইতি কঃ পদার্থ ?” অর্থাৎ রস কোন পদার্থকে বলে ? উত্তর-অন্বেষার সারাৎসার- “আস্বাদ্যত্বাৎ” (নাট্যশাস্ত্র, -৬/৩৫), যা আস্বাদিত হয়। রসবাদী হিসেবে আরেক খ্যাতিমান চতুর্দশ শতাব্দের বিশ্বনাথ কবিরাজ তাঁর ‘সাহিত্য দর্পণ’ গ্রন্থে ভরত-এর কথারই প্রতিধ্বনিত করলেন- রস্যতে ইতি রসঃ। (সাহিত্য দর্পণ, -১/৩) অর্থাৎ যা রসিত বা আস্বাদিত হয়, তা-ই রস। এবং রসের ব্যাপ্তি প্রকাশ করলেন এভাবে- “সর্বোহপি রসনাদ্ রসঃ” (সাহিত্য দর্পণ, -৩/৪২) অর্থাৎ রসন বা আস্বাদন হেতু সবই রস। হাঃ হাঃ, তাহলে তো আস্বাদন হেতু তালের রস আর কাব্যরসে কোন তফাৎ দেখি না ! তফাৎ হয়তো এটাই যে তালের রসের আস্বাদন করতে হলে গাছ বেয়ে আগায় চড়তে হবে। আর কাব্যরসের আস্বাদ পেতে হলে ডুব দেবার নিমিত্তে কাব্যহ্রদে ঝাঁপ দিতে হবে। বিষয়টা যেহেতু কাব্যকেন্দ্রিক, তাই যাঁরা কাব্যসাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, লেখালেখি করেন কিংবা এ থেকে রস আস্বাদনে আগ্রহী বা রসসৃষ্টির সম্ভাব্য নেশায় বুঁদ হতে আকাঙ্ক্ষি, তাঁদের জন্য ওইদিকে ঝাঁপ দেয়া ছাড়া আপাত কোন গতিক দেখছি না। এক্ষেত্রে সাহিত্যের মহাফেজখানায় খুঁজে খুঁজে হয়রান না হয়ে আপাতত যে দুটো অবশ্যপাঠ্য বইকে সঙ্গি করে নিলে পথ খুঁজতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না, তা হচ্ছে নরেন বিশ্বাসের ‘কাব্যতত্ত্ব-অন্বেষা’ এবং ‘অলঙ্কার অন্বেষা’। এ নিবন্ধে এই বিষয়ক অর্থাৎ প্রাচ্য-অলঙ্কার শাস্ত্র তথা কাব্যতত্ত্ব সংশ্লিষ্ট যাবতীয় তথ্য ও বাচন-বর্ণনার জন্য আমি শ্রদ্ধেয় নরেন বিশ্বাসের কাছে অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতায় এ দুটো গ্রন্থ-সহায়তার ঋণ স্বীকার করে নিচ্ছি।

চিত্রকল্পের ধান ভানতে গিয়ে রসিক পাঠকের কাছে যদি মনে হয় যে রসময় শিবের গীত শুরু হয়ে গেছে, তাহলে যথাসম্মান রেখেই বলে নেয়া ভালো যে গুরুচণ্ডালিকা টানার বদস্বভাবের একটা সুবিধাও রয়েছে। শিবের গীতের মধ্যেই ধানভানার কিছু অর্থহীন অর্থময় কথা সুরের ঠেলায় ভাসিয়ে দেয়া যায়, যা পরবর্তীতে প্রকৃত ধানভানার সময় এসে অযথা বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না। অতএব, কথা যখন রসেরই, তা আস্বাদন করতে দোষ কোথায় !

মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্ ।।
- রামায়ণ, বালকাণ্ড ২/১৫

‘ওরে ব্যাধ তুই (যেহেতু) কামমোহিত ক্রৌঞ্চযুগলের পুরুষটিকে হত্যা করেছিস, (সেজন্য) কোনদিনই তুই (জীবনে) সুখী হবি না (প্রতিষ্ঠা পাবি না)।’

তমসার তীরে ভ্রমণরত অবস্থায় আদি কবি বাল্মীকি ক্রৌঞ্চমিথুনের শোকে নিজের অজান্তেই যে করুণ রসের শ্লোক উচ্চারণ করে বসলেন, তখনও কি বুঝেছিলেন তিনি কী রচনা করলেন ! এর পরই তাঁর হৃদয়ে যে বিস্ময়বোধ সঞ্চারিত হলো, প্রশ্ন জাগলো- ‘কিমিদং ব্যাহৃতৎ ময়া’। (এ কী ! এর স্বরূপ কী ?)। ‘কথমেবং রচিতানীত্যেবং বিস্ময়াবহানি’- (এ বিস্ময়াবহ এমন সৃষ্টি, তা কেমন করে নির্মাণ করলাম)!

মিথলজিক্যালি বা পৌরাণিক সত্য অনুযায়ী আদি কাব্যের এই প্রথম উন্মেষের পর এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন জনের হাত ধরে একে একে জন্ম হতে থাকে নানান কাব্যতত্ত্বের। খ্রীস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দের থেকে খ্রীস্টীয় চতুর্থ শতাব্দের মধ্যবর্তী যে কোন সময় অর্থাৎ আনুমানিক দু’হাজার বছর আগে ভারতীয় আলঙ্কারিকদের মধ্যে প্রাচ্য-কাব্য সাহিত্যে রসতত্ত্বের প্রবর্তক হিসেবে আচার্য ভরতকেই প্রথম ও প্রধান পুরুষ হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়। একইভাবে রসতত্ত্বই তাবৎ কাব্যতত্ত্বের শ্রেষ্ঠতত্ত্বরূপে স্বীকৃত হয়। তাঁর মতে ‘রস’ই হচ্ছে সাহিত্যবৃক্ষের বীজ:

যথা বীজাদ ভবেদবৃক্ষো বৃক্ষাৎপুষ্পং ফলং তথা।
তথা মূলং রসাঃ সর্বেতেভ্যো ভাবা ব্যবস্থিতাঃ।।
-নাট্যশাস্ত্র, ৬ষ্ঠ অধ্যায়।
অর্থাৎ বীজ হতে যেমন গাছ হয় এবং গাছ হতে ফুল ও ফল, তেমনি রসবীজ হতেই কাব্য এবং এ কাব্যের ফুল ফল (ভাব, রীতি, অলঙ্কার ইত্যাদি) এই রসেরই প্রকাশ।

সকল তত্ত্বের সারতত্ত্ব এই ‘রসকে চিহ্ণিত করলেও আচার্য ভরত অলঙ্কাররীতি, গুণ কিংবা কাব্যের সৌন্দর্য-বিষয়ক বিষয়গুলোকে কোনভাবেই উপেক্ষা করেন নি। বরং রস’কে রসময় করে তুলতে এসব বিষয়ের আবশ্যিকতাকেই তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন।

প্রাচ্য অলঙ্কারশাস্ত্রে নাট্য বা কাব্যসাহিত্যে যে নয়টি রসে’র অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে তা হলো, শৃঙ্গার বা আদিরস, বীররস, রৌদ্ররস, হাস্যরস, করুণরস, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত এবং শান্তরস। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ আবার সংগৃহীত প্রাচীন লোকছড়াগুলোকে ‘ছেলেভুলানো ছড়া’ নাম দিয়ে এর রসমাধুর্যকে ‘বাল্যরস’ নামে আখ্যায়িত করেন। রসবোধ থাকলে সাহিত্যের এই রসময় জগতে রসের সন্ধান পাওয়া যায় বৈ কি। তবে সেখানে রস থাকতে হয়। পণ্ডিতজনেরা বলেন, ভাব থেকে এই রসের উৎপত্তি। অর্থাৎ রস এমনি এমনি আসে না, ভাবের উপস্থিতি আবশ্যক। সৃষ্টির আদিকাল হতে মানুষের মনে অজস্র ভাব বা ইমোশন বর্তমান। আর ভাব (চিত্তবৃত্তি) বা ইমোশনই হচ্ছে রসের মৌলিক উপাদান। আলঙ্কারিকদের ভাষায়, কাব্যানুভবের ফলে মনের এই ‘ভাব’ই অনুকূল আবহে রসে রূপান্তরিত হয়। পণ্ডিতের বিচারে ‘ভাব’ লৌকিক কিন্তু ভাব থেকে রূপান্তরিত ‘রস’ অলৌকিক। এই ‘ভাব’টা হলো স্থায়ী অবস্থা, আর ‘রস’টা আপেক্ষিক। নির্দিষ্ট ভাব থেকে কার মধ্যে কীভাবে কতটুকু রসের আবির্ভাব বা সঞ্চারণ ঘটবে তা রসগ্রহীতার যোগ্যতা এবং রসস্রষ্টার মুন্সিয়ানার উপরেও নির্ভর করে।

কোন্ স্থায়ী ভাব থেকে কীরকম রসের সঞ্চার ঘটবে তা-ও পণ্ডিতজনেরা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। রতি স্থায়ীভাব থেকে শৃঙ্গার বা আদিরস, উৎসাহ থেকে বীররস, ক্রোধ থেকে রৌদ্ররস, হাস থেকে হাস্যরস, শোকভাব থেকে করুণরস, ভয় থেকে ভয়ানক, জুগুপ্সা থেকে বীভৎস, বিস্ময় থেকে অদ্ভুত এবং শম স্থায়ী ভাব থেকে শান্তরস। রসশাস্ত্র অনুযায়ী এই নয়টি স্থায়ী ভাব নাট্য বা কাব্যে বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের সংযোগে নয়টি রসে সার্থক পরিণতি লাভ করে। ভাবের সাথে এই যে বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের সংযোগ তা কি আর এমনি এমনি ঘটে ! রসগ্রহীতার সাথে এই সংযোগ ঘটিয়ে দেয়ার জন্য রসস্রষ্টাকে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু কারুকাজের আশ্রয় নিতে হয়। সাহিত্য যেহেতু একটি শব্দ বা অর শিল্প, তাই শব্দের মায়াজালে বহুমাত্রিক বিন্যাসের মাধ্যমে তাঁকে এমন এক অভাবনীয় চিত্ররূপ তৈরি করতে হয় যাতে সেই উদ্দিষ্ট ভাবের নাড়িতে সার্থক অনুরণন তোলে। বহুমাত্রিক শব্দবিন্যাসে রচিত এই কাল্পনিক চিত্ররূপকেই সাহিত্যের ভাষায় বলা হয়ে থাকে চিত্রকল্প বা রূপকল্প। এতে যে কাঙ্ক্ষিত রসের উদয় হয় তাতে স্পন্দিত হয়ে রসগ্রাহী পাঠক মাত্রেই হয়ে ওঠে আপ্লুত। আর এভাবেই সাহিত্য তার সার্থকতা নিয়ে এগিয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।

প্রাচীন অলঙ্কার শাস্ত্রে কোথাও কি এই চিত্রকল্পের উল্লেখ আছে ? থাকলেও কোন্ রূপে কীভাবে কোন্ প্রেক্ষিতে রয়েছে তার তূল্যমূল্য বিচার পণ্ডিত গবেষকদের জন্যই তোলা থাক। তবু যে নামেই থাক, বিষয়টা যে কাব্যসাহিত্যের স্পন্দনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তাতে বোধ করি কারোরই দ্বিমত নেই। তবে আধুনিক কাব্যকলায় এই চিত্রকল্পই যে কালে কালে বহুল আরাধ্য ও ধারাবাহিক চর্চার জরুরি বিষয় হয়ে ওঠেছে, এতে কোন সন্দেহ নেই।


কাব্যের স্বরূপ

‘উপমাই কবিতা।’ বাংলা কাব্যকলায় ইউরোপীয় সাহিত্যরীতির অভিযোজনের মাধ্যমে তিরিশের দশকের আধুনিকতাবাদী পঞ্চপাণ্ডবের অন্যতম প্রধান পাণ্ডব হিসেবে স্বীকৃত কবি জীবনানন্দ দাশের কথিত এই উক্তিটিতে কাব্যের স্বরূপ অন্বেষণে হাজার বছরের প্রাচীন ভারতীয় বা প্রাচ্য কাব্যতত্ত্বের সাথে কোথাও কোনো বিরোধ আছে কি ? কবিতায় বা আরো সীমিত অর্থে কিশোর কবিতায় চিত্রকল্পের সন্ধান করতে হলে আমাদের কাব্যের স্বরূপটাকে সন্ধান করা আবশ্যক বৈ কি।

কাব্যের আত্মা বা স্বরূপ অন্বেষণ করতে গিয়ে প্রাচ্য কাব্যতত্ত্বে বেশ কিছু মতবাদের উন্মেষ ঘটে। রসবাদ ছাড়াও এর মধ্যে অলঙ্কারবাদ, রীতিবাদ, বক্রোক্তিবাদ, ধ্বনিবাদ প্রসিদ্ধ।

অলঙ্কারবাদ: ষষ্ঠ শতকের আচার্য দণ্ডী তাঁর কাব্যাদর্শে ঘোষণা করেন- ‘কাব্যাশোভাকরণা ধর্ম্মান্ অলঙ্কারাণ্ প্রচক্ষতে’, অর্থাৎ অলঙ্কার কাব্যের সৌন্দর্যবিধায়ক ধর্ম।
সপ্তম শতকের বিখ্যাত অলঙ্কারশাস্ত্রী আচার্য ভামহকেই অলঙ্কার-প্রস্থানের প্রবক্তা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি তাঁর কাব্যালঙ্কার গ্রন্থে ‘শব্দার্থৌ সহিতৌ কাব্যম্’ অর্থাৎ শব্দ ও অর্থের সার্থক মিলনকেই কাব্য বলেছেন। কাব্যালঙ্কারের গুরুত্বকে তিনি তুলে ধরেন এভাবে-

রূপকাদিলঙ্কারস্তস্যানৈর্বহুধোদিতাঃ।
না কান্তমপি নির্ভূষং বিভাতি বণিতামুখম্।।

রূপকাদি অলঙ্কার অন্যের দ্বারা বিচিত্র (হু) ভাবে বর্ণিত, প্রেয়সীর মুখ স্বভাবসুন্দর (কান্ত) হলেও অলঙ্কার ব্যতীত তার সৌন্দর্য প্রকাশ পায় না। ভামহের বিবেচনায় অলঙ্কারই কাব্য এবং কাব্যের কাব্যত্ব অলঙ্কার সংযোগেই সৃষ্ট হয়। তিনি আচার্য ভরত ব্যাখ্যাত রসকেও অলঙ্কার বলে গণ্য করেন।
সাহিত্যের অন্যতম মাধ্যম বয়ানসর্বস্ব পদ্য’র ক্ষেত্রে এই অলঙ্কারবাদ বহুল প্রযোজ্য হলেও কবিতার অন্তর্গত স্বরূপ বিশ্লেষণে অক্ষমতার জন্য শেষপর্যন্ত এই তত্ত্ব পণ্ডিত মহলে আদৌ স্বীকৃত হয়নি।

রীতিবাদ: অষ্টম শতকের শেষভাগ হতে নবম শতকের প্রথমভাগে অবস্থানকারী আচার্য বামনই প্রাচ্যকাব্যতত্ত্বের ইতিহাসে রীতিবাদের প্রধান প্রবক্তা হিসেবে স্বীকৃত। অলঙ্কারবাদীদের বিরোধিতা করে তিনি বলেন-
কাব্যং গ্রাহ্যম্ অলঙ্কারাৎ
সৌন্দর্য্যম্ অলঙ্কারঃ।
কাব্য অলঙ্কার দ্বারাই গ্রাহ্য হয় বটে, তবে সৌন্দর্যেই অলঙ্কার।
বামনের বক্তব্য অনুযায়ী এ সৌন্দর্য কাব্যদেহের রূপলাবণ্য। বাইরের অলঙ্কার বা অনুপ্রাস-উপমাদি এই সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে মাত্র। তাই তিনি কাব্য বিচারে ‘গুণ’ বা মাধুর্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বলেন, এই গুণ, যা রমণীদেহের লাবণ্যের সঙ্গে তূল্য, কাব্যের নিত্যধর্ম এবং অলঙ্কার কাব্যের অস্থির বা অনিত্যধর্ম। ‘রীতিরাত্মা কাব্যস্য’, অর্থাৎ গুণাত্মক পদরচনার বিশিষ্ট ‘রীতি’ই কাব্যের আত্মা। অতএব কাব্যকলায় স্টাইল বা রীতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এই স্টাইল হলো মুখশ্রী।
কবিতার স্বরূপ অন্বেষণে এই তত্ত্ব খুব একটা কার্যকর না হলেও কাব্য রচনায় নতুনত্ব বা উপস্থাপনভঙ্গির বৈচিত্র্যকে কেউ অস্বীকার করেন না।

বক্রোক্তিবাদ: দশম থেকে একাদশ শতকের মধ্যভাগীয় প্রসিদ্ধ পণ্ডিত কুন্তক’কেই কাব্যকলায় গুরুত্বপূর্ণ বক্রোক্তিবাদের প্রবর্তক হিসেবে গণ্য করা হয়। ‘বক্রোক্তিজীবিত’ গ্রন্থে তিনি ‘বক্রোক্তি কাব্য জীবিতম্’ বা বক্রোক্তিই কাব্যের জীবন বা আত্মা বলে অভিহিত করেন। আচার্য ভরত ব্যাখ্যাত রস সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, ‘রস কাব্য-প্রাণ বক্রোক্তিকেই পরিপুষ্ট-উপভোগ্য করে তোলে মাত্র।’ তাই অলঙ্কার, রীতি, ধ্বনি বা রস কোনটিতেই কাব্যের আত্মা নয়, কাব্যে জীবন বা আত্মা হচ্ছে একমাত্র ‘বক্রোক্তি’। এই বক্রোক্তির সঙ্গে সমন্বিত না হলে অলঙ্কার, রীতি, রস সব কিছুই আকাঙ্ক্ষিত ফল সরবরাহে ব্যর্থ হয়।

‘বক্রোত্তিরেব বৈদগ্ধ্যভঙ্গীভণিতিরুচ্যতে।’
অর্থাৎ বৈদগ্ধপূর্ণ ভঙ্গিমাময় উক্তিই বক্রোক্তি।
আচার্য মহিম ভট্ট কুন্তকের এই বক্রোক্তির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেন-
প্রসিদ্ধং মার্গমুৎসৃজ্য যত্র বৈচিত্র্যসিদ্ধয়ে।
অন্যথৈবোচ্যতে সোহর্থঃ সা বক্রোক্তিরুদাহৃতা।
যেখানে বৈচিত্র উৎপাদনের (সিদ্ধির) জন্য, স্বাভাবিক (প্রসিদ্ধ) পথ (অর্থ) পরিত্যাগ করে ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করা হয় (অন্য প্রকার উক্ত হয়), সেই অর্থই বক্রোক্তি বলে কথিত।

প্রাচ্য কাব্যতত্ত্বে কুন্তকের এই বক্রোক্তিবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা আমাদের সমকালীন সাহিত্যেও সমভাবে প্রযোজ্য। কেননা ভরত থেকে শুরু করে অভিনবগুপ্ত এবং পরবর্তীকালে সংস্কৃত-অলঙ্কার শাস্ত্রীদের মতো সমকালীন সাহিত্য সমালোচকরা যেখানে শব্দ, অর্থ, অলঙ্কার বা বিশেষ কোন বাক্য শ্লোক কিংবা শ্লোকার্ধের ওপর নির্ভর করে কাব্যত্ব নির্ণয়ে প্রয়াসী, কাব্যের খণ্ডাংশকে সম্বল করে আত্মার অন্বেষায় ব্রতী, কুন্তক সেখানে সমগ্র কাব্যের বক্তব্য বা সার্বিক উক্তির ওপর সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি এ সত্য প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন যে, বৈচিত্র্য বা বক্রতা কেবল কাব্যের বিশেষ কোন অংশকে নির্ভর করে নির্মিত হয় না, সমগ্র রচনায় তা প্রকীর্ণ থাকে। তিনি কাব্য নির্মাণে সবসময়ই অভিনবত্বের পক্ষপাতী ছিলেন বলেই প্রচলিত সূত্রে নিজেকে কোথাও সমর্পণ করেন নি। তাঁর উপলব্ধি, ‘কাব্যের প্রকৃত সিদ্ধি কথায়, রচনায় বা উক্তিতে।’ উক্তি বা প্রকাশের ওপরই কাব্যের সার্থকতা বহুলাংশে নির্ভরশীল। সে উক্তি যদি অসাধারণ বক্রোক্তি না হয় তবে কাব্য কোন মতেই শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার হয় না এবং তাঁর ভাষ্য অনুসারে যুগে যুগে কবিগণ তাঁদের কবি-শক্তির বলে কাব্যের উক্তিতে (শব্দ, বাক্য অলঙ্কার সর্বত্র) বিপর্যয় সৃষ্টি করেন বৈচিত্র্য-সৃষ্টির নিমিত্ত, নবতর প্রকাশকে স্বাগত জানানোর জন্যে।

‘যৎ কিঞ্চনাপি বৈচিত্র্য তৎসর্বং প্রতিভোদ্ভবম।’ কুন্তকের কাব্যবিচারের লক্ষ্য স্বাধীন-সার্বভৌম কবি-শক্তি নির্মিত বক্রোক্তি, রস উপলক্ষ মাত্র। কারণ তাঁর মতে কাব্য নির্মাণ রস দিয়ে হয় না, হয় কথা বা উক্তি দিয়ে অর্থাৎ বক্রোক্তির সাহায্যে। কাব্যের উদ্দেশ্য যেখানে রস সৃষ্টি, সেখানেও কবিকে প্রথমেই শরণাপন্ন হতে হয় উক্তি বা বক্রোক্তির। ফলে তাঁর বিচারে রস গভীর অর্থে বক্রোক্তিরই অন্তর্ভূক্ত। কাব্যের সার্থকতা সর্বত্রই কথা বা উক্তি নির্ভর এবং যে উক্তি কখনই কেবল উক্তি নয়- অবশ্যই বক্র উক্তি এবং এ বক্রোক্তি নির্মাণই কবিত্ব।
ছড়াসাহিত্য বিশ্লেষণে এই তত্ত্ব খুবই কার্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ। কবিতার ক্ষেত্রেও তা কোন অংশে ফেলনা নয়।

ধ্বনিবাদ: প্রাচ্য কাব্যতত্ত্ব বিচারে অলঙ্কারশাস্ত্রের ইতিহাসে কাব্য-সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ে কিংবা কাব্যের আত্মা নিরূপণে ধ্বনিবাদই এ যাবৎ সবচাইতে প্রতিষ্ঠিত মতবাদ, যা বাংলা কাব্যের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। ‘কাব্যসাত্মা ধ্বনিনিরিতি।’ ধ্বনিই কাব্যের আত্মা, এটাই ধন্যালোকের মর্মবাণী।

আনুমানিক নবম শতকের আচার্য আনন্দবর্ধনকে ধ্বনিবাদের প্রবক্তা হিসেবে ধরা হয়। যদিও ধ্বনিকারিতা গ্রন্থটির মূল রচয়িতার নাম অজ্ঞাত, আনন্দবর্ধন ‘আলোক’ নামে বৃত্তি অংশের লেখক, আর অভিনবগুপ্ত প্রায় একশত বছর পর এই আলোক বা বৃত্তির টীকা লিখেছেন ‘লোচন’ নামে। অর্থাৎ ধন্যালোকের কারিকা (যাঁর নাম জানা যায় নি), তার বৃত্তি বা আলোক (আনন্দবর্ধন) এবং বৃত্তির টীকা লোচন (অভিনবগুপ্ত)- এ তিনের সমন্বিত ফল ধ্বনিবাদ।

‘ধ্বনি’ কাব্যতত্ত্বের একটি পারিভাষিক শব্দ। এ ধ্বনি বলতে বোঝায় কাব্যের একটি বিশেষ অর্থ, যা বাক্যে বা কবিতায় ব্যবহৃত শব্দাবলীর সাক্ষাৎ অর্থ নয়, অথচ সেই শব্দার্থ বা বাচ্যার্থকে অবলম্বন করে ইঙ্গিতে ব্যঞ্জনায় প্রতীয়মান হয়ে ওঠা অন্য একটি অর্থ। যখন কোন সহৃদয় পাঠক কাব্য পড়েন, তখন তিনি কেবল কবিতায় ব্যবহৃত শব্দাবলীর অর্থে তৃপ্ত নন, সেই বাচ্যার্থকে অতিক্রম করে তাঁর চেতনায় প্রতীয়মান হয়ে ওঠে ভিন্ন আরেকটি গভীরতর ব্যঞ্জনাময় অর্থ, কাব্যতত্ত্বের পরিভাষায়- বাচ্যার্থ অতিক্রমী সেই প্রতীয়মান অর্থই ‘ধ্বনি’।

ধ্বনিবাদীদের বক্তব্য হচ্ছে- কাব্যের আত্মা শব্দ নয়, অর্থ নয়, অলঙ্কাররীতিও নয়, এসবের অতিরিক্ত অন্য কিছু। এই ‘অন্যকিছু’ কী ?
প্রতীয়মানং পুনরণ্যদেব বস্তুতি বাণীষু মহাকবিনাম।
য-ওৎ প্রসিদ্ধাবয়ব্যতিরিক্তিং বিভাতি লাবণ্যামিবাঙ্গনাসু।।
-ধ্বন্যালোকে, ১/৪
-মহাকবিদের বাণীতে দেহাতিরিক্ত (শব্দ, অর্থ রীতি) অন্য একটি প্রতীয়মান (অর্থরূপে) বস্তু থাকে। যা রমণীদেহের লাবণ্যের মতোই কাব্যের শরীরে দীপ্তিমান।

এই যে অতিরিক্ত বস্তু, এটাই কাব্যের লাবণ্য বা কান্তি, ধ্বনিবাদীদের ভাষায় এটাই হচ্ছে ধ্বনি। এটা অলঙ্কার রীতি নয়, এখানে শব্দ ও অর্থ গৌণ হয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে প্রতীয়মান অর্থ। বাচ্যার্থকে অতিক্রম করে যায় প্রতীয়মান অর্থ, যদিও বাচ্যার্থের দ্বারাই তার প্রকাশ ঘটে।

যথার্থঃ শব্দো বা তমর্থ মুপসর্জণীকৃত স্বার্থে।
ব্যঙ্গ্যঃ কাব্যবিশেষঃ স ধ্বনিরিতি সুরভিঃ কথিত।।
যেখানে কাব্যের অর্থ ও শব্দ নিজের প্রাধান্য পরিত্যাগ করে প্রতীয়মান অর্থ বা ব্যঙ্গার্থকে প্রকাশ করে, সেখানে সেই ব্যঙ্গার্থ রূপ কাব্যবিশেষই ধ্বনি হিসেবে আখ্যায়িত হয়।

ধ্বনিবাদীদের মতে অলঙ্কার কাব্যের আত্মা বলে বিবেচিত হতে পারে না। কারণ অঙ্গনাদেহে লাবণ্য না থাকলে, শত অলঙ্কারে বিভূষিতা করলে তাকে যেমন সুন্দরী বলা যায় না এবং লাবণ্যময়ী নারীকে কোন অলঙ্কার না পরালেও তার স্বভাব-সৌন্দর্য যেমন ঢাকা পড়ে না, ঠিক তেমনি যমকালো অলঙ্কারে সজ্জিত বাক্যও কাব্য হয় না (ধ্বনির অভাবে) আবার অলঙ্কারহীন বাক্যও সার্থক কাব্য হয় যদি তাতে ‘ধ্বনি’ থাকে দীপ্র।

তবে ধ্বনিবাদীরা রস’কে অস্বীকার করেন নি। ‘নহি তচ্ছূণ্যং কাব্যং কিং চি-দস্তি।’ (-ধন্যালোক, ২/৩ টীকা) অর্থাৎ রসহীন কোন কাব্য নেই। অবশ্য সে রসের প্রকাশ ঘটেছে ধ্বনিরূপে। এবং অভিনবগুপ্তের মতে রসধ্বনিই কাব্যের আত্মা।

প্রাচ্য কাব্যতত্ত্বের উপরোক্ত তত্ত্বগুলোকে মাথায় রেখে আমরা জীবনানন্দের সেই উক্তিটিতে ফিরে যাই আবার, ‘উপমাই কবিতা।’ অলঙ্কার শাস্ত্রে ‘উপমা’ শব্দটি সাধারণত তুলনা অর্থেই বহুল ব্যবহৃত। ইংরেজিতে simile বলতে বিসদৃশ বস্তুর মধ্যে সাদৃশ্য আবিষ্কার বুঝায়। সংস্কৃতে ‘যদতত্তৎসদৃশম ইতি’- (গার্গ্য)। এই সংজ্ঞার অর্থ দাঁড়ায়- ‘যৎ অতৎ তৎ-সদৃশম’ অর্থাৎ যৎ (যে বস্তু) অতৎ (সে বস্তু নয়) তৎ-(যে বস্তুর) সদৃশম (মতন বা ন্যায়)। এক কথায় যে-বস্তু সে-বস্তু নয় (তবু) সেই বস্তুর মতোন।

আধুনিক কালের আলঙ্কারিকদের কাছেও উপমা হচ্ছে- দুই বিজাতীয় বস্তুর মধ্যে সাদৃশ্য আবিষ্কারের ফলে যে চমৎকৃতি, -তা-ই। আর এ কারণেই তুলনার উপর ভিত্তি করে কাব্য-সাহিত্যে যে প্রচুর অলঙ্কার সৃষ্টি , সে অলঙ্কারকেই সাধারণত উপমা বলা হয়। কাব্য সাহিত্যে উপমার ভূমিকা বৈচিত্র্যময় এবং রসসৃষ্টি ক্ষমতাও সন্দেহাতীত ! অলঙ্করশাস্ত্রে উপমার বহু প্রকার ভেদ রয়েছে। তবে ভিন্ন আঙিকে সাহিত্যের অলঙ্কার শাস্ত্রটাকে মূলত উপমানির্ভর দলিল বললে কি খুব অত্যুক্তি হবে ?

বাঁশের মতো লম্বা বা দড়ির মতো সাপ বললে সহজ কিছু উপমা তৈরি হয়ে যায়। এতে আমাদের মনশ্চোখে সাদৃশ্য বিবেচনায় সাধাসিদে একটা পূর্বঅভিজ্ঞতালব্ধ চিত্রও তৈরি হয়ে যায় বৈকি। মেঘকালো কেশ বললে মেঘের কালোত্বের সাথে সাদৃশ্য ভেসে ওঠে। কিন্তু ‘নতুন চরের মতো মুখ’ বা ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ পঙক্তিগুলোকে বিশ্লেষণ করলে কি কেবল উপমাই মনে হয় ? মুখ কোনো চর নয়, তবু নতুন চরের সাথে তুলনা টানলেই মনের মধ্যে আমাদেরকে কেবল একটা চিত্র নয় বরং এমন একটা কল্পচিত্র রচনা করার প্রয়াস নিতে হয় যে আমরা কেবল আঁকতেই থাকি, বারবার, তবু তৃপ্তি মেটে না। অর্থাৎ আক্ষরিক বা বাচ্যার্থের বাইরে আরেকটা প্রতীয়মান অর্থ আমাদের উপলব্ধিতে যে অভূতপূর্ব রস নিয়ে উপস্থিত হয়, এর কোনো ব্যাখ্যাই তাকে প্রকৃত ফুটিয়ে তুলতে অক্ষম, কেবল এক চমৎকার উপলব্ধি ছাড়া ! সোজা কথায় ব্যাখ্যাতীত এক চিত্রকল্প তৈরি হয়ে যায়। পাখির নীড়ের মতো চোখের ক্ষেত্রেও এই অভূতপূর্ব অনুভূতিতে আপ্লুত হয়ে অন্য এক তৃপ্তিকর ব্যাখ্যাহীনতার মধ্যে সাঁতরাতে থাকি আমরা। এই যে দুই বিজাতীয় কল্পনার মধ্যে সাদৃশ্য টেনে একটাকে আরেকটার প্রতিতুলনায় নিয়ে এসে বিভ্রম তৈরি করার উপমা ফাঁদা, এটাই চিত্রকল্প। এবং এই চিত্রকল্পতাই কবিতা। এটাকেই জীবনানন্দ বলেছেন উপমা এবং উপমা বলতে তিনি চিত্রকল্পকেই বুঝিয়েছেন।

এই চিত্রকল্পে অলঙ্কার তত্ত্বের শব্দ ও অর্থের সার্থক মিলন যেমন ঘটবে, রীতিবাদের স্টাইলেও থাকবে চমক। বক্রোক্তিবাদের সার্থক প্রয়োগে বৈচিত্র্য বা অভিনবত্ব যেমন আসবে, ধ্বনিবাদের মূলসুর আক্ষরিক অর্থের গভীরে এক অভাবনীয় অর্থময় উপলব্ধিরও জন্মান্তর ঘটবে। তাই আধুনিক কাব্য বিশ্লেষণে কবিতার প্রাণস্বরূপ চিত্রকল্প নামের যে অনিবার্য শর্তটিকে সযত্নে লালন করা হচ্ছে তা যে প্রাচ্যকাব্যতত্ত্বের সমন্বিত রূপটিকেই ধারণ করে নিয়েছে, তা বললে বোধ করি বাড়িয়ে বলা হবে না। এই চিত্রকল্পতাই কবিতার প্রাণ। সে কারণেই পঠিত রচনায় কাঙ্ক্ষিত কবিতাটি খুঁজতে হলে যথার্থ চিত্রকল্পের সাম্পানে চড়ে ভাবের অনির্বচনীয় দোলায় দোলে দোলে অক্ষরের নদীটাকে পারি দিয়ে ভিড়তে হয় ওপারের সেই আশ্চর্যময় জগতে। যেখানে নতুন নতুন উপলব্ধির নিরন্তর অপেক্ষাগুলো বসে থাকে ইন্দ্রিয়ঘন অতৃপ্ত অনুভবের ডালি নিয়ে।


কিশোর-কবিতা, কবিতায় কৈশোর

কিশোর-কবিতা বললেই আমাদেরকে স্বতসিদ্ধভাবেই বুঝে নিতে হয় যে, এটা সেই কবিতা যেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষই হোক কৈশোরিক অনুষঙ্গতা অনিবার্য। এবং সেই চিরায়ত কৈশোর যা আমাদের প্রত্যেকের বুকের গভীরে বহমান এক স্থিরিকৃত নদী। যার ঢেউ, যার স্রোত, যার কুলকুল ধ্বনি মানুষ জীবনভর বয়ে যায় শুনে যায়। চিরায়ত কিশোরের এই ব্যক্ত-অব্যক্ত অনুভব ধারণ করে যে কবিতা তা-ই কিশোর-কবিতা। এখানে কবি-পরিচয় মুখ্য নয়, মুখ্য কৈশোরিক অনুভব। প্রবীণ কবির সেই কবিতাটিও কিশোর-কবিতা, যেখানে তাঁর কৈশোরিক মনটা খেলা করে। আবার সেই কিশোরের লেখা কবিতাটাও কিশোর-কবিতা হবে না যদি সেখানে কিশোর অনুষঙ্গতা না থাকে। এ জন্যই কিশোর হয়েও কৈশোরিক উপলব্ধির অনুপস্থিতির কারণে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সব কবিতাই কিশোর-কবিতা হয় নি। অনেকগুলোই হয়ে গেছে সাধারণ বা বয়স্ক-মনন কবিতা। যেহেতু সব মানুষের মধ্যেই একটি চিরায়ত কিশোর বাস করে তাই কিশোর-কবিতাকে সবার জন্য কবিতা বলা যেতে পারে। কিন্তু সবার জন্য কবিতাই কিশোর কবিতা নয়।

‘কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ছোট ভাই-বোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি- রাবেয়া রাবেয়া-
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!

কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী
কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহন
পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ
মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠোনে ছড়ানো জাল আর
বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর।

কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর
ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা।

কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।’

---(কবিতা এমন/ আল মাহমুদ)

আল মাহমুদের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’ থেকে নেয়া এই কবিতাটা কি কিশোর-কবিতা ? কৈশোর স্মৃতিকারতা এখানে প্রবলভাবে উপস্থিত হলেও বয়স্ক মননের বেশ কিছু অনুষঙ্গ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকাটাই বলে দেয় এটা কিশোর-কবিতা নয়। একইভাবে নিচের রচনাটিকেও প্রকৃতপক্ষে কিশোরকবিতা বলার উপায় নেই। শৈশব বা কৈশোরের যাবতীয় অনুষঙ্গ উপস্থিত থাকলেও ওটা মূলত শৈশবস্মৃতিকাতর একটা নস্টালজিক বোধে আক্রান্ত বয়স্ক রচনা। এখানে বয়স্ক মনের হাহাকারই প্রধান।

রূপকথা, ছড়া আর
অদেখা ঠাকুরমার-
ঝুলি ভরা গল্পের, কল্পের বই-সব-

কিছু নেই
তাকাতেই পিছু-ভাবি কই-সব
ফেলে আসা
ভাসা-ভাসা, স্মৃতি জুড়ে শৈশব!

ভরা-গাঙে লাফ-ঝাঁপ
বরষার টুপটাপ
পুকুরের তাজা কই, উনুনের খই-সব-

কিছু নেই
তাকাতেই পিছু-ভাবি কই-সব
ফেলে আসা
ভাসা-ভাসা, স্মৃতি জুড়ে শৈশব!

খেজুরের মধু-রস
পাকা আম টসটস
এলোমেলো হাঁটা-পথ, খাঁটি মাঠা-দই সব-

কিছু নেই
তাকাতেই পিছু-ভাবি কই-সব
ফেলে আসা
ভাসা-ভাসা, স্মৃতি জুড়ে শৈশব!

প্রজাপতি সেই মন
ছুটে চলা প্রতিক্ষণ
বড় হওয়া মাছে-ভাতে, গাছে ওঠা মই-সব-

কিছু নেই
তাকাতেই পিছু-ভাবি কই-সব
ফেলে আসা
ভাসা-ভাসা, স্মৃতি জুড়ে শৈশব!

জোছনায় ভেজা-রাত
কত ফাঁকি, অজুহাত
হাসি-খুশি থইথই, প্রিয় হইচই-সব-

কিছু নেই
তাকাতেই পিছু-ভাবি কই-সব
ফেলে আসা
ভাসা-ভাসা, স্মৃতি জুড়ে শৈশব!


---(শৈশব / সাজ্জাদ হুসাইন)

কিন্তু নিচের রচনাটি সেই চিরায়ত কিশোরের উপলব্ধি এমন চমৎকারভাবে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে যে এটাকে একটা সার্থক কিশোরকবিতা না মেনে উপায় আছে কি ?

ও মেঘ ! আমায় সত্যি করে
তোর ঠিকানা বল-
কোত্থেকে তুই পাসরে এতো
স্নিগ্ধ-শীতল জল ?

মিষ্টি পায়ে তোর কি আছে
নূপুর, হীরের মল-
তোর বাড়িতে বাস করে কি
নৃত্য-মেয়ের দল ?

বিজলি পেলো কোথায় অমন
রঙিন আলোর ঢল-
আমায় দে-না তোর পরিচয়
করিসনে আর ছল।

তোর কথা আজ যতই ভাবি
পাই না খুঁজে তল-
মেঘ ; আমাকে বিষ্টি করে
সঙ্গে নিয়ে চল।

---(ও মেঘ / সাজ্জাদ হুসাইন)

একজন কিশোরের মনোজগতে যে বিষয়টিকে ঘিরে তার সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিবাহিত হয় তা হলো তার স্বপ্ন। তার চলা ফেরা চিন্তা ভাবনা উচ্ছ্বাস আনন্দ বন্ধুসঙ্গ নিঃসঙ্গতা বিষণ্নতা কষ্টবোধ ইত্যাদি সবকিছুর গভীরে প্রভাব সৃষ্টিকারী অনুষঙ্গ এই স্বপ্নকাতরতাই তাকে চেতনে-অবচেতনে এমন বিচিত্র সত্তায় রাঙিয়ে তোলে। কখনো আয়নার মতো স্বচ্ছ, কখনো বা গাঢ় কুজ্ঝটিকাময় আচ্ছন্নতায় সে বিভোর হয়ে থাকে। এই কিশোর-মনন পাঠ না জানলে কারো দ্বারা কিশোর-সাহিত্য রচনা কখনোই সম্ভব নয়। আর সে সাহিত্যটি যদি হতে হয় কিশোর-কবিতা, তাহলে স্বার্থক চিত্রকল্পের গভীরে এই বিভোরতাটুকুই আঁকতে হয় দারুণ দক্ষতায়। সরাসরি বিবরণধর্মীতার ব্যর্থ জোলোপ্রবণতায় আক্রান্ত না হয়ে যথার্থ চিত্রকল্প সৃষ্টির মাধ্যমে আক্ষরিক অর্থময়তার গভীরে শুশুকের মতো ছলকে উঠবে সেই স্বপ্নকাতরতাটুকুই। এখানেই কিশোর-কবিতার স্বার্থকতা।

আমি যখন পদ্য লিখি, সবার খুবই অসন্তোষ
কেউ বা বলেন পক্ক আমি, কেউ বা ধরেন মাথার দোষ!
আমি তখন স্বপ্নে দেখি শক্তি-সুনীল, শঙ্খ ঘোষ।

আমি যখন ছবি আঁকতে খাতার পাতায় টানছি লাইন,
মা বলে যান, ‘পড়তে বসো। আঁকা বন্ধ- বাবার আইন।’
হা হতোস্মি! আমার কেবল স্বপ্নে বিকাশ, গণেশ পাইন!

আমি যখন গান ধরেছি বুকের গভীর আহাদে,
পড়শিগণে টিটকারি দেয়-‘নচির সঙ্গে পাল্লা দে!’
কিন্তু আমার স্বপ্নে আসেন হেমন্ত আর মান্না দে!

আমি এখন পড়ছি শুধু, পড়ছি দিনরাত্রি তাই।
বাবা ভীষণ খুশি এবং মা বলছেন, ‘বল, কী চাই?’
বলবো, ‘শুধু স্বপ্ন দেখার সময় যেন একটু পাই!’

--(স্বপ্ন / প্রমোদ বসু)

একজন কিশোরের জন্য বর্তমান প্রতিকূল বাস্তবতায় স্বপ্ন দেখার একটু ফুরসৎ পাবার এই যে আর্তি এটাই শেষপর্যন্ত স্পষ্ট হয়েছে। যদিও কবিতাটির মধ্যে স্বপ্নদেখার বিষয়টি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে এবং স্পষ্ট উল্লেখ করে বলে দেয়া হয়েছে, আমাদের শিল্পতৃষ্ণার পরিতৃপ্তির চূড়ান্ত উৎকর্ষতা না পেলেও কাব্যগুণে কিশোর-কবিতা হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে বলে মনে করতে পারি আমরা।

টিনের চালে বৃষ্টি পড়ে
আকাশ থেকে স্বপ্ন ঝরে।
বৃষ্টি ঝরে ঘুমের মতো
শ্রাবণ রাতে অবিরত।
ঘুমের মধ্যে জেগে থাকি
মাথায় ওড়ে সবুজ পাখি।
টিনের চালে বৃষ্টি পড়ে
স্বপ্নে স্বপ্নে দু-চোখ ভরে।

--(টিনের চালে / হুমায়ুন আজাদ)

এইটাও কিশোর-কবিতা হিসেবে উৎড়ে গেলেও চিত্রকল্পের চূড়ান্ত উৎকর্ষতায় অতৃপ্তি রয়ে গেছে। কেননা এখানেও স্বপ্নবোধটাকে আক্ষরিক উল্লেখহেতু আমাদের চিত্র-কল্পনা খুব বেশি গভীরতা পায় না। এই স্বার্থকতাই আমরা নীচের কবিতাটিতে পেয়ে যাই, চমৎকার কিছু ইচ্ছার গভীরে আসলে সেই কৈশোরিক স্বপ্নটাই ফুটে ওঠে যথার্থ চিত্রকল্পতার মাধ্যমে-

আমি যদি হই ফুল, হই ঝুঁটি-বুলবুল হাঁস
মৌমাছি হই একরাশ,
তবে আমি উড়ে যাই, বাড়ি ছেড়ে দূরে যাই,
ছেড়ে যাই ধারাপাত, দুপুরের ভূগোলের ক্লাস।
তবে আমি টুপটুপ, নীল-হ্রদে দিই ডুব রোজ
পায় না আমার কেউ খোঁজ।
তবে আমি উড়ে-উড়ে ফুলেদের পাড়া ঘুরে
মধু এনে দিই এক ভোজ।
হোক আমার এলো চুল, তবু আমি হই ফুল লাল
ভরে দিই ডালিমের ডাল।
ঘড়িতে দুপুর বাজে; বাবা ডুবে যান কাজে;
তবু আর ফুরোয় না আমার সকাল।

--(রুমির ইচ্ছা / নরেশ গুহ)


একটা স্বপ্নাতুর কিশোর যখন তার নিজস্ব গণ্ডি বাড়ির সীমানায় দাঁড়িয়ে বহু দূর দিগন্তের দিকে তাকায়, তার দৃষ্টিরশ্মির সাথে স্বপ্নরাও যে ভোঁ দৌঁড়াতে থাকে তা হয়তো শিশুটির সজ্ঞান উপলব্ধিতে আসে না। কিন্তু মনের গভীরে যে ইচ্ছার বুননটা চলতে থাকে সেই বোধটাই তো কিশোর-ভাবনা-

বহুদূরে মানে দূ-উ-উ-রে।
বাড়ির সীমানা,
যত কিছু জানা-
চেনা মাঠ-ঘাট,
অদূরের হাট,
বুড়ো বটমূল-
আর ইশ্কুল-
সব কিছু ছেড়ে অনেকটা পথ ঘুরে
একাই যাচ্ছি, বহুদূরে মানে দূ-উ-উ-রে।

নেই সংশয়,
বাবা-মার ভয়,
স্কুলের শাসন,
স্যারের ভাষণ,
নেই কিছু নেই
তবু তো আছেই
কত কী না-জানা অজানারা চোখ জুড়ে।
একাই যাচ্ছি বহুদূরে মানে দূ-উ-উ-রে।

দেখি নি যে ফুল,
যে নদীর কূল,
নিঝুম বাদাড়,
বুনো ঝোপ-ঝাড়,
আকাশের নীল,
তারা ঝিলমিল-
অবাক তাকিয়ে বাতাসের সুরে সুরে
একাই যাচ্ছি, বহুদূরে মানে দূ-উ-উ-রে।

আরো দূরে ধু-ধু
দিগন্ত শুধু।
আছে তারপরও
ছবি থরোথরো।
দৃশ্যের টানে
মন হার মানে-
তাইতো যাত্রা সব কিছু ছেড়ে-ছুড়ে।
একাই যাচ্ছি বহুদূরে মানে দূ-উ-উ-রে
দূ-উ-উ-রে
দূ-উ-উ-রে।

--(দূরে / আবু হাসান শাহরিয়ার)


ধরতে না পারা ইচ্ছেটাকে বুড়োরা পরিত্যাগ করলেও চিরায়ত কিশোরের স্বপ্নজগৎ কখনোই তা ত্যাগ করে না। স্বপ্নের কারখানা যে কিশোর মন, সেখানে আরেক বিকল্প স্বপ্ন তৈরি হতেই থাকে তার আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার তীব্র আগ্রহে-

আকাশ তুমি দূরে থাকো
হাত বাড়িয়ে ধরতে পারি নাকো
দূরেই যদি থাকলে তবে নীলের গায়ে তুমি
শাদা মেঘের স্বপ্ন কেন এমন করে আঁকো।

আকাশ তুমি এত্তো বড় কেন?
হাত বাড়িয়ে ধরতে পারি যেন
এমন ছোট হলে তোমার দোষ হতো কি বেশি?
তুমিই বলো আমার কথা খুব কি যেন তেন?

আকাশ তুমি অনেক ছোট হবে
এখন বলো কখন এবং কবে
আসবে কাছে এত্তোটুকু হয়ে আমার মতো
না হলে আর কেমন করে বন্ধু হবে তবে?

শোনো আকাশ তোমার গায়ে কারা
জ্বলে এবং নেভে? যাদের বলে সবাই তারা।
ওরা কি সব তোমার ছেলে নাকি?
তোমার ডাকে দিচ্ছে রোজই এমন করে সাড়া।

তোমার মেয়ে চাঁদকে দেখে আমি
ডাকলে কাছে বললো হেসে, ‘নামি
কেমন করে বলো এখন মায়ের কথা ছাড়া।’
তুমি আকাশ নিজকে কেন ভাবো এতোই দামী?

হতেই যদি ছোট্ট আমার মতো
তোমায় নিয়ে দূরের পাড়া যতো
ঘুরলে বলো কী মজাটাই পেতে তখন তুমি!
এখন বলো কেইবা দেবে তোমায় মজা অতো?

তবু আমার কথাগুলোর কোনো
হলো না দাম আচ্ছা তবে শোনো
বড় হয়েই ছোঁয়াবো হাত তোমার গায়ে আমি।
যতোই তুমি বড় হবার স্বপ্ন মনে বোনো।

--(আকাশ তুমি / আহমাদ মাযহার)

কিশোরের নিষ্কলুষ মনে যা কিছু তার কাছে তার স্বপ্নের সাথে সংগতিহীন মনে হয় তা-ই সে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে চায়। তার ইচ্ছের রঙে ভরে তুলতে চায় পৃথিবী-

জল ভর ভর মেঘ ছেড়েছে ঘর
মেঘ ছুঁয়েছে আকাশবাড়ি
ভিজলো জলে নীলের শাড়ি
বৃষ্টি ছুঁলো বনবনানী দিগন্ত প্রান্তর

মন ভর ভর মেঘ ছেড়েছে ঘর

হাওয়ায় চড়ে কোথায় যাবে মেঘ
ধানের চারা দেয় ইশারা
বৃষ্টি তাতে দেয় যে সাড়া
মেঘ ছোটালো তাই কি হাওয়ার বেগ

বাদলা দিনে কোথায় যাবে মেঘ !

--(মেঘ ছেড়েছে ঘর / হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী)

কিন্তু এই স্বপ্নের মধ্যেও কি বিভ্রম জাগে না ? জাগে। কখনো কখনো সে এই বিভ্রমেও আক্রান্ত হয়। সে উপলব্ধি বুঝে না, জানে না উপলব্ধির রঙ। তবু অনুভবে দোলে ওঠা এই অচেনা বিচিত্র ইচ্ছাটাকে চেখে দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে ঠিকই তাড়া করে অদ্ভুত মোহে-

শিল্পী তুমি আঁকতে পারো-
ভোরের ছবি?
-পারি
তপ্ত রবি?
-পারি
ফুলের বাগান?
-পারি
মাঠভরা ধান?
-পারি
পাখির ডানা?
-পারি
শিশির দানা?
-পারি

মুক্তিযুদ্ধ?
-না না
একাত্তরের ছবি কি যায়
রঙতুলিতে আনা!

--(শিল্পী ও মুক্তিযুদ্ধ / মুহিব নেছার)

কিশোরের মুক্ত-স্বাধীন মনে চাপিয়ে দেয়া শৃঙ্খলার বাস্তবতা যখন তার ইচ্ছে বা আগ্রহের প্রতিকূল হয়ে ওঠে তখন কিশোর-মনের স্বপ্নময় ইচ্ছাও যে কত যুক্তিহীন হয়ে ওঠে তা হয়তো বুড়োদের কাছে কৌতুককর মনে হতে পারে ! কিন্তু কিশোরের কল্পনা যুক্তি বা বাস্তবতার বাছবিচার করে চলে না। এখানে সে চূড়ান্ত সার্বভৌম-

অঙ্ক নিয়ে বসলে আমার কখন কী যে হয়
টেবিলটাও পর হয়ে যায় বইগুলো সব ভয়।
ভয়ের চোটে ভাবতে থাকি শহর ভেঙে কেউ
দালান কোঠা বিছিয়ে দিয়ে তোলে খেতের ঢেউ।
রাস্তাগুলো নদী এবং গলিরা সব খাল
ইলেকট্রিকের খাম্বাগুলো পাল্টে হলো তাল।
মোটরগাড়ি গরুর পালে হাম্বা তুলে হাঁটে
পুলিশগুলো গুলিস্তানে নিড়ানি ঘাস কাটে।
আব্বা হলেন কাকতাড়ুয়া আম্মা হলুদ পাখি
বুবুরা সব ভুঁইকুমড়ো পাতায় ঢেকে রাখি।

সবাই যখন পাল্টে গেছে নিজের ঘরে নাই
আমিই তখন ইচ্ছে মতন খোকন হয়ে যাই।
কেউ বলে না আঁক কষতে কেউ বলে না লেখ্
কেউ ধরে না কানের লতি, কেউ বলে না শেখ্।
ঢাকা শহর, ঢাকা শহর সবুজ হয়ে যাও
কলেজগুলো সর্ষে বাগান ভার্সিটিতে লাউ।

--(ভয়ের চোটে / আল মাহমুদ)

স্বপ্নময়তাই যেখানে চিরায়ত কিশোর-মনের সহজাত প্রবণতা, সেই নিষ্কলুষতার মধ্যে যদি সামাজিক বিভেদ ব্যবধান কিশোর প্রবৃত্তিকে আহত খণ্ডিত করতে উদ্যত হয়, তা হয়ে ওঠে খুবই বেদনাদায়ক। বড়দের এইসব জটিল কূটিল মনস্তত্ত্বে ছোট্ট কিশোরের থৈ পাওয়ার কথা নয়। এক কঠিন হীনমন্যতাবোধে আক্রান্ত কিশোর তখন মরমে মরে যায়, বিদ্রোহী সত্তা তার ঘৃণা প্রকাশ করে মর্মস্পর্শী শিশুতোষ অভিব্যক্তি দিয়েই-

নাম বলেছি , ধাম বলেছি- এবং বয়স কত
সেই সঙ্গে এও বলেছি মা হয়েছেন গত।
দশখানা আঁক কষতে দিলে একটা হবে ভুল
আমাকে তাও নিতে নারাজ এই তোমাদের স্কুল !

কারণ আমার প্যান্টে ফুটো জামার কলার ফাঁসা
উড়াল সেতুর নীচে আমার পাখ-পাখালির বাসা।
বাবা উধাও পুলিশভ্যানে তখন আমি ছোটো,
মরার আগে মা বলেছেন মানুষ হয়ে ওঠো।

সেই কারণেই বই পড়েছি , পথ কুড়োনো বই
তোমার সঙ্গে আজকে না হোক , কালকে তো খেলবোই।

--(লিখছি আমি / মৃদুল দাশগুপ্ত)

নমূনা হিসেবে এরকম ক্লাসিক উদাহরণ প্রচুর রয়েছে এবং অবারিত না হলেও হয়তো আরও বেশ কিছু উপস্থাপন করার অবকাশ থেকেই যায়। তবে সদিচ্ছা সুদৃঢ় হলে এগুলোর আন্তরিক সংগ্রহ ও অধ্যয়নচর্চার বিষয় করে তোলা অসম্ভব কিছু নয়। স্বপ্নপ্রবণ কিশোর-মনের এই যে চিরায়ত বিস্ময়, অভিব্যক্তির নিরন্তর পরিবর্তনশীলতা, পরিবেশ-প্রকৃতি-সামাজিক শৃঙ্খলার সাথে নিত্যকার দ্বন্দ্ব-বাধ্যবাধকতা এবং তা থেকে মুক্ত হওয়ার বিদ্রোহী ইচ্ছাভ্রমন, তার সবই অক্ষর-বুননে মূর্ত করে তোলা জটিল তো বটেই। কাব্যের তত্ত্ব-তালাশ আয়ত্তে এলেও কিশোর মনন, মনস্তত্ত্ব, মনোজগতের দ্বন্দ্ব বিকাশ এবং সহজাত গতি প্রকৃতিকে যথাযথ আত্মস্থ করতে না পারলে একে কবিতার মোড়কে প্রকাশ করা দুরুহ বৈ কি। অন্যদিকে নিবিড় পর্যবেণগুণে চিরায়ত কিশোর-প্রকৃতির সুলুক-সন্ধান কেউ হয়তো পেয়ে গেলেন ঠিকই, কিন্তু কবিতা কী বা কেন ও কখন একটি রচনা কবিতা হয়ে ওঠে তা যদি উপলব্ধির তারে ঝংকৃত না হয় কিংবা কবিতার রূপ-মাধুর্য্যের প্রয়োজনীয় অধ্যয়ন অধ্যাবসায় না থাকে, তাহলেও শিল্পোত্তীর্ণ কোন কিশোর-কবিতা নির্মাণ শুধু অসম্ভবই নয়, অপচেষ্টাও। বাংলাকাব্যের সম্ভ্রান্ত ঐতিহ্যকে মাথায় রেখে আমাদের ক্লাসিক নিদর্শনগুলোকে যত বেশি চর্চার বিষয় করে তুলতে পারবো আমরা, সৃজনশীলতার গতিধারা ততই লক্ষ্যাভিমুখী ও বেগবান হয়ে উঠবে।
এবং এটা মনে রাখা বোধ করি খুবই জরুরি যে, সাধারণ কবিতার চেয়ে কিশোর-কবিতা নির্মাণ শতগুন জটিল একটা বিষয়। তা যেন আমাদের সৃজনশীল কবিসত্তা কখনোই বিস্মৃত না হয়।
(৩০-০১-২০০৯)

[nirmaan-muktangon]

Monday, January 19, 2009

# কবি-কবিতা-ছড়া-শিল্প-বিভ্রম...


কবি-কবিতা-ছড়া-শিল্প-বিভ্রম...
রণদীপম বসু

গুরুচণ্ডালিকা
আলোচনার কান ধরে টান দিলে কবিতা এসে যেতেই পারে। তাই প্রথমেই বলে নেয়া ভালো যে এটা কোন কবিতার কাশ বা কাব্য আলোচনা নয়। স্রেফ অভিজ্ঞতা বিনিময়। আপ্তজনদের গপ্পোসপ্পো থেকে শিক্ষার্থী হিসেবে কিছু শিখতে চাওয়াজনিত যে বদহজমের সূত্রপাত, সেটাকে খালাস না করা অব্দি স্বাচ্ছন্দ্যের দেখা পাচ্ছি কই ! তাছাড়া শেখা বা জানার প্রক্রিয়াগত ভিন্নতা ব্যক্তিমাত্রেই স্বতন্ত্র এবং নিজস্ব মেধা, বোধ ও সীমাবদ্ধতার স্কেলে নিয়ন্ত্রিত বলে রহিমকে রাম বানিয়ে ফেলা বা শিল্পের কলা’কে হস্তী-ভক্ষ্য কদলীবৃক্ষ বানিয়ে গিলে ফেলার সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয়ার নয়। এমন দুর্যোগ ঘনীভূত হলে হাত তোলে জানান দেয়ার স্বাধীনতা সবারই রয়েছে, যে, আর্ট আর অষ্টকদলী একই বস্তু নয় !

দুর্দান্ত সব কবিতা উপহার দিয়েও বোহেমিয়ান শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো শক্তিমান কবি যখন নিজেকে পদ্যকার হিসেবে ঘোষণা দেয়ার কৌতুক আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন, তখন সত্যিকারের কবিরা নিজ নিজ কৃতকর্মগুলো হাতে নিয়ে একটু নড়েচড়ে বসেন বৈ কি। কবি শব্দের আগে একটা ‘সত্যিকারের’ শব্দ বসানো মানেই যুক্তিবিদ্যার আরোহী পদ্ধতি অনুযায়ী কাল্পনিকভাবে হলেও প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্টো স্বভাবের আরেকটা সত্তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেয়া হয়। তাহলে কি মিথ্যাকারের কবিও রয়েছে ! রয়েছে বৈ কি ! নইলে কবি জীবনানন্দ দাশ কেনই বা সাধ করে ‘কবিতা লিখে অনেকেই, কেউ কেউ কবি’ উক্তি করে এমন ল্যাঙ মারতে গেলেন !

জীবনানন্দের এই উক্তিটাতে যে অবশ্যই জটিল একটা বিভ্রম লুকিয়ে আছে তা অস্বীকার করার জো নেই। তাই উক্তিটাকে খুব সরলভাবে নেয়ারও উপায় নেই। এ কারণেই কৌতুহলটা উচ্চকিত হয়ে ওঠে, বিভ্রমটা কী ? তাঁর উক্তির প্রথম অংশটা আবারো আমরা খেয়াল করি, ‘কবিতা লিখে অনেকেই...’। হাঁ, লিখতেই পারে ! তাতে কী হয়েছে ? হয়েছে বা হচ্ছে অনেক কিছুই, আবার কিছুই না। যে কোনো কাজের অনিবার্য ফলাফলের মতোই কিছু সম্ভাব্যতাকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, এদের ‘কেউ কেউ কবি’ বলে। কিন্তু উক্তির প্রথম অংশে কাজের ডিটেইলসটা কিন্তু স্পষ্ট নয়। এখানেও কতকগুলো সম্ভাব্যতার অনির্দেশ্যতা দেখতে পাই আমরা। যেহেতু অনেকেই কবিতা লিখেন, তাহলে অনেকে আবার অকবিতাও লিখেন। আবার অনেকে কবিতাই লিখেন না। অকবিতা লিখলে কবি হওয়া যায় কিনা, সে বিষয়টা এখানে অপ্রযোজ্য হয়ে আছে। অকবিতা লিখা এবং কবিতা না লিখা আবার দুটো ভিন্ন বিষয়। আমাদের অনেকেই যে প্রশ্নটি করতে দ্বিধা করেন তা হলো, কবিতা না লিখলে কি কবি হওয়া যায় না ? প্রশ্নটাকে অর্থহীন ভেবে উড়িয়ে দেয়ার কোন কারণ নেই। জীবনানন্দের ভাষায় কেবল কবিতা লিখলেই যদি কবি হওয়া না যায়, তাহলে উল্টো যুক্তিতে যদি বলি, কবিতা না লিখেও কেউ কেউ কবি, এটাকে কি ফ্যালাসি বলবো ? মোটেও ফ্যালাসি নয় তা।

যুক্তিবিদ্যার পরিভাষায় ফ্যালাসি হচ্ছে অর্থহীন প্রতিতুলনা দিয়ে কোন উদ্ভট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। যেমন, আমার দাঁড়ি আছে, ছাগলেরও দাঁড়ি আছে, অতএব আমি ছাগল এইরকম। তাই বিষয়টা ফ্যালাসি না হলেও ফ্যালাসির মতো মনে হতে পারে। কেননা জীবনানন্দের উক্তি থেকে এটা অন্তত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কবিতা লেখাটা কবি হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোন ফ্যাক্টর বা শর্ত নয়। তাহলে কী সেই শর্ত ? আলোচনার এই উন্মুক্ততায় এসে এখানেই আমরা থমকে যাই। সেরকম কোন শর্ত এখনো স্বতঃসিদ্ধতা পায় নি বলেই অনুমিত একটা ধারণা থেকে আমরা এটা বুঝে নেই যে, কবি একটি অন্তর্গত সত্তার নাম। একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে গেলে যে সব সৎ-গুণাবলী ও সুকৃতি থাকতে হয়, একজন কবির সত্তায় তা তো থাকবেই, বরং মেধা মনন আর সৃজনশীলতায় মাখানো আরো কিছু উপলব্ধির অনুরণনও সেখানে থাকতে হয়।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসবে, আমরা কী করে বুঝবো ‘তিনি’ একজন কবি ? বুঝার কি কোনো কায়দা আছে ? এ ক্ষেত্রে আবারো যুক্তির সিঁড়িকেই মাধ্যম করে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। একবাক্যে যেহেতু জগতের সবাইকে বাছবিচারহীনভাবে কবি বলে স্বীকৃতি দেয়াটা বালখিল্য উদ্ভটতা হিসেবে গণ্য হবে, তাই উল্টোভাবে ‘কেউ কবি নয়’ থেকে পর্যায়ক্রমে সামনে কবি হওয়ার দিকে আগানোটাই যুক্তিসঙ্গত প্রক্রিয়া বলে মনে হয়। অর্থাৎ ধীরে ধীরে একজন কবি তৈরি হয়ে ওঠেন। সুকৃতি আর মানবিক গুণাবলীর সমন্বয়েই এই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা আগাতে থাকে। যাঁর মধ্যে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার মানবিক গুণাবলীরই ঘাটতি রয়েছে, তিনি যদি মানুষই হয়ে ওঠতে না পারলেন, কবি হবেন কী করে ! এখানে আবার প্রশ্ন, মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ একজন পরিপূর্ণ মানুষ আর কবির মধ্যে তফাৎটা কোথায় তাহলে ? পরিপূর্ণ একজন মানুষ হওয়ার পরও কবি হয়ে ওঠতে বাকি যে মেধা মনন বোধ উপলব্ধি ও সৃজনশীল সুকৃতিটুকু দরকার, মূলতঃ সেটাই তফাৎ। এবং খুব সঙ্গতভাবেই, যেহেতু প্রসঙ্গ কবি হওয়ার, তাই শেষ পর্যন্ত কবিতা বা কাব্যবোধের বিষয়টা অনিবার্যভাবে চলে আসাটাই তো স্বাভাবিক এবং যুক্তিযুক্ত।

জীবনানন্দের কথাতেই ফিরে যাই আবার- কবিতা লিখে অনেকেই, কেউ কেউ কবি। এখন মনে হয় কথাটার অন্তর্গত ভাবের আরেকটু কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা। আমাদের উপলব্ধিবোধটাকে একটু অন্তর্মুখী করে কয়েকটা বিষয় এবার মিলিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। ধরে নেই প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় অগ্রগামী, ব্যক্তিক স্বভাব, রুচি, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সার্বিক জীবনাচারে মানবিক বিবেচনাবোধে উত্তীর্ণ একজন ‘তিনি’ যে চমৎকার একজন মানুষ হিসেবে স্বীকৃত হতেই পারেন তাতে আমাদের দ্বিমত নেই। কিন্তু স্রষ্টা হিসেবে তাঁর রচনায় যদি সৃজনশীল কাব্যবোধের প্রকাশ না ঘটে, তাহলে কবি পরিচয়ের প্রাসঙ্গিকতা এখানে কতোটা প্রযোজ্য হবে ?

আবার অন্যদিকে একটি রচনা কবিতা হয়ে ওঠতে যে সব শর্তাবলী প্রয়োগ আবশ্যক, সেই সব কিছু ঠিক রেখেই ‘তিনি’ উৎকর্ষ কাব্যসাধনায় মগ্ন রয়েছেন ঠিকই। কিন্তু ব্যক্তি জীবনে তিনি অসৎ, সামাজিক জীবনে অসদাচারী এবং সামষ্টিকভাবে তিনি মানবতার বিরুদ্ধ অবস্থানে নিজেকে জড়িত রেখেছেন বা পশ্চাৎপদ মানসিকতায় তিনি প্রগতির বিপক্ষ-কাতারে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখেন, তাঁকে কি আমরা কবি বলতে পারি ?

‘কবিতা লিখে অনেকেই, কেউ কেউ কবি ’, জীবনানন্দের কথাটিকে এসব শ্রেয়বোধ দিয়ে যদি বিশ্লেষণ করি আমরা, তাহলেই হয়তো অনেকগুলো বিভ্রমের পর্দা আমাদের চোখের সামনে থেকে নির্দ্বিধায় অপসৃত হয়ে যাবে। আমরা কি আদৌ করবো তা ? গুটিকয় পঙক্তি বা বাক্য রচনা করেই আমরা বুঝে না বুঝে নিজের বা অন্যের নামের আগে ‘কবি’ উপাধীর সুদৃশ্য যে তকমাটি অনায়াসে বসিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করছি না, এটা কি আমাদের বাছবিচারহীন উদারতার মূর্খামী, না কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বুদ্ধিবৃত্তিক বালখিল্যতা, এই আত্মবিশ্লেষণটা কি এখন জরুরি নয় ?

অতঃপর ছড়াকার-ছড়াশিল্পী সমাচার
ছড়াসাহিত্যেও ইদানিং মনে হয় একটা পরিচিতি সংকট ক্রমেই দৃষ্ট হয়ে ওঠছে। রচনার মূল যে অভিক্ষেপ ছড়া, সেটা কি হচ্ছে নাকি হচ্ছে না সে বিষয়টা খুব সচেতনভাবে আমরা এড়িয়ে তো যাচ্ছিই, বরং কেউ কেউ আবার এতদিনকার ‘ছড়াকার’ পরিচয়টাকে নিজের জন্য অতি অপ্রতুল বিবেচনায় আকর্ষণীয় নতুন তকমা ধারণ করতে চাচ্ছি ‘ছড়াশিল্পী’ নামে ! ছড়াকে যেনতেন একটা আকার হয়তো দিয়ে দিচ্ছি আমরা, কিন্তু এই ছড়াকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করতে নিজস্ব মন ও মননে কতটুকু সৃজনশীল শিল্পসত্তা ধারণ করতে হয়, তা কি আদৌ ভাবি আমরা ?

যারা এই অল্পতে তুষ্ট নন, তাঁদেরকে বিনীতভাবে বলি, একজন ব্যক্তি ক্রমে ক্রমে শিল্পী হয়ে ওঠলে এটা সমাজের জন্য সংস্কৃতির জন্য অবশ্যই গৌরবের ব্যাপার। এতে সমাজ সংস্কৃতি ঋদ্ধ হয়ে ওঠে। আমরাও তো এই উত্তরণই চাই। কিন্তু চিন্তাভাবনায় ঘাটতি রেখে এমন স্বেচ্ছামুকুট ধারণ করার আগে অন্ততঃ এক হাজারবার ভাবা জরুরি নয় কি যে, অন্যের কথা বাদ দিলেও নিজের কাছেই নিজেকে যেন জবাবদিহিতায় পড়তে না হয় ? কারণ তিনিই শিল্পী যিনি নিজের মধ্যে শিল্পের কলাকৈবল্যসমেত এক মহৎ কবিসত্তা ধারণ করেন।

আমাদের লোকছড়া নিয়ে ব্যাপক সন্ধান ও গবেষণা থাকলেও আধুনিক ছড়া সাহিত্যের গবেষণাকর্ম খুঁজতে এখনো আমাদেরকে দূরবীণ আর অনুবীক্ষণযন্ত্র হতে নিয়েই বেরোতে হয়। ঘাড় ফেরালেই যেদিন এই চর্মচক্ষে আধুনিক ছড়াসাহিত্যের প্রয়োজনীয় গবেষণাকর্ম অনায়াসলব্ধ হয়ে ওঠবে, সেদিনই হয়তো ছড়াসাহিত্যের এরকম বহু অনর্থক সংকটও অনেকাংশে কেটে যাবে। আমাদেরকে সেদিনের প্রতীক্ষায়ই থাকতে হবে বৈ কি...।
(১৭/০১/২০০৯)
(Image:Sculpture 'the thinker' by Rodin)

Friday, December 5, 2008

@ প্রসঙ্গ: ছড়া কিংবা ছড়া নিয়ে গাঁঠছড়া...|















প্রসঙ্গ: ছড়া কিংবা ছড়া নিয়ে গাঁঠছড়া...|
রণদীপম বসু

ছড়া নিয়ে ছেলেমী করার ঝোঁকটা সম্ভবত ছড়ার জন্মেতিহাসের সাথেই সম্পর্কিত। কিন্তু এই ঝোঁকের মধ্যে যদি দায়বদ্ধতার কোন ছোঁয়া না থাকে তাহলেই তা হয়ে উঠে বিপর্যয়কর। কেমন বিপর্যয় ? হতে পারে ছড়াকে তার আত্মপরিচয় থেকে হটিয়ে দেয়া বা অন্য কিছুকে ছড়া নামে প্রতিস্থাপিত করা ! মানুষের ভীড়ে মানুষের মতো কতকগুলো হনুমান গরিলা ওরাংওটাং বা এ জাতীয় কিছু প্রাণী ছেড়ে দিয়ে এক কাতারে মানুষ বলে চালিয়ে দিলে যা হয়।

মানুষের দুই পা দুই হাত থাকে, ওগুলোরও দুই পা দুই হাত। পায়ের উপর ভর করে এরা সবাই হাঁটে। মেরুদণ্ড কিছুটা কুঁজো করে হাঁটা মানুষের মধ্যেও রয়েছে। বিশেষ করে বার্ধক্য আক্রান্ত মানুষের জন্য। মাঝে মাঝে বাঁদরামী সুলভ আচরণ মানুষও করে। তাহলে কি মানুষ আর হনুমান গরিলা এক হয়ে গেলো ! বিবেচনার বাহ্যিক দৃষ্টি ঝাপসা হলে দু’টোর মধ্যে তফাৎ ঘুঁচে যাওয়া বিচিত্র নয়। আর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রাণীগুলোর সংখ্যাধিক্য ঘটতে থাকলে এক সময়ে হনুমান গরিলাই যদি মানুষের পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করতে থাকে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে কি ? তবুও হনুমান গরিলার দ্বারা মানুষের স্থান দখল করা সম্ভব নয়। পার্থক্যের ভুলে কিছুকাল দাপাদাপি করলেও ঠিকই এদের আসল পরিচয়গুলো বেরিয়ে আসে। কোন্ আসল পরিচয় ? এটা হলো অন্তর্গত স্বভাব, আচরণের প্রকৃতি আর সৃজনশীল প্রণোদনায় মানুষের সাথে এদের মৌলিক ও ব্যাপক পার্থক্য।

কিন্তু এখানেও কি সমস্যামুক্ত আমরা ? কীসের নিরিখে নির্ধারণ করবো মানুষ আর গরিলার অন্তর্গত স্বভাবের ভিন্নতা, আচরণের প্রকৃতিগত বিভেদ বা সৃজনশীল প্রণোদনার পার্থক্য ? সেই নির্ধারণসূত্রটা জানা হয়ে গেলে পার্থক্য নির্ণয় করা আর দুরুহ থাকে না। তাই প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে একটা হনুমান বা গরিলাকে মানুষের পূর্ণ আকৃতি দেয়া হলেও মানুষের স্থান দখল করা তার কখনোই সম্ভব নয়, প্রকৃতিগতভাবেই। তেমনি ছড়া নিয়ে আমাদের জটিলতার শেষ নেই। ছড়া তো কোনো প্রাণী নয় যে গুঁতো দিলেই তার প্রকৃতিগত ভাষা বা স্বভাবসুলভ আচরণ দিয়ে নিজের ধাত বা পরিচয়টা জানিয়ে দেবে ! ছড়া একটা শিল্প, অক্ষরের কারুকাজ, মূর্ত চেহারায় বিমূর্ত ব্যঞ্জনাধারী শব্দ বা শ্রুতিশিল্প। কবিতা, পদ্য, গান, পুঁথি, পাঁচালী এসবও তো একই পদের জিনিস, অক্ষরের কারসাজিই। তাহলে ছড়া কেন ছড়া ? কীসের নিরিখে আমরা তা নির্ধারণ করবো ?

মানুষের জীবনে উদ্ভুত জটিল জটিল সমস্যাগুলোকে সহজ সরল উদারভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারলে নাকি হাইপার টেনশন, ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি অসহ্য জঞ্জালগুলো ঘাড়ে নিয়ে ডাক্তারের কাছে সকাল-বিকাল দৌঁড়ানোর ঝামেলা বহুলাংশে হ্রাস পেয়ে যেতো। হয়তো খুবই সত্য কথা। তাই বলে হনুমান গরিলার সাথে মানুষের প্রকৃতিগত পার্থক্যের জটিলতাগুলোকে খুব উদার প্রাণে সরলীকরণ করে যত্রতত্র পারস্পরিক কোলাকুলি করার দৃশ্যটা নিশ্চয়ই মানুষ জাতির জন্য সহজগ্রাহ্য হয়ে উঠবে না। তাই কিছু কিছু জটিলতাকে সহজ করে দেখার সুযোগ নেই। অতএব ছড়া কেন ছড়া, বা ছড়া কী বা এর বৈশিষ্ট্যই বা কী, কোন্ কোন্ শর্ত পূরণ করলে একটা শব্দশিল্পকে আমরা ছড়া বলবো এ ধরনের কোনো নির্ধারণসূত্র কি কোথাও পেয়েছি আমরা ?

ছড়া কেন ছড়া ?

কান টানলে যে মাথা আসে তার পেছনে সঙ্গত কারণ হলো, যিনি কান টানেন, হয়তো মাথা আসার জন্যই টানেন। টানের চোটে কানটা মাথা থেকে আলগা হয়ে চলে আসুক এটা বোধ করি তিনিও চান না। তাছাড়া আলগা হয়ে যদি এসেই যেতো তাহলে ওই বাড়তি অংশটা কি আর কান থাকতো ? না কি এর গুরুত্ব থাকতো ! আলগা করতে চাইলে কষ্ট করে কেউ টানাটানি না করে কানটা কেটেই নিয়ে আসতো। অতএব, ছড়া কেন ছড়া, আলোচনার এই কান ধরে টান দিলে আরো যেসব প্রাসঙ্গিকতার ডিপো ঐ মাথাটি চলে আসে তা এড়ানোর কোন উপায় থাকে কি ? উপায় থাকে না বলেই অদম্য কৌতূহলবশে কাউকে না কাউকে এখানে নাক গলাতে হয়। আর নাক গলাতে গেলে যা হয়, নাকটা গলে যাক্ বা খশে পড়ুক বা আস্তই থাকুক, কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা তো ঘটেই। আজকাল আমরা যতই অলস বা অসমর্থ হই না কেন, আমাদের পূর্বসূরীদের অনেকেই যে এতে নাক গলিয়েছেন তা তো নিশ্চিৎ। তাঁদের অভিজ্ঞতা ধার করেই আমরা না হয় আমাদের আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি।

ছড়া কেন ছড়া, তা জানতে হলে আমাদেরকে চলে যেতে হয় ছড়ার কোষ্ঠিবিচারে। আর তখনি নানা প্রসঙ্গ এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে আমাদেরকে। ছড়া কী, ছড়ার উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ইত্যাদি ইত্যাদি এবং রথি মহারথিরা কে কী বলেছেন এর তূল্যমূল্য বিচারে। সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ পন্থা হচ্ছে ছড়াকে ছড়ার হাতে ছেড়ে দিয়ে মানেমানে কেটে পড়া। এবং কঠিন পন্থা হচ্ছে ছ্যাচড়া জোঁকের মতো ছড়ার পিছে লেগে থেকে ছড়াকে ছ্যাড়াবেড়া ব্যতিব্যস্ত করে তোলা। এছাড়া আরেকটা মধ্যপন্থা রয়েছে। নিজেকে আড়ালে আবডালে রেখে এখান ওখান থেকে খুঁটে খুঁটে যা যতটুকু দরকার হজম পরিমাণ নিয়ে একটা মিশ্রব্যঞ্জন বানিয়ে ফেলা। অতএব কোন ক্রমবিচার না মেনে এই মধ্যপন্থায় খানিকটা আগানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

সাহিত্য বিচারে বাংলা ছড়ার বিশাল ভাণ্ডারকে দুটি অংশে ভাগ করা যেতে পারে। (১) লোকছড়া, এবং (২) আধুনিক ছড়া। ছড়ার যে অংশ অজ্ঞাত রচয়িতার মৌখিক সৃষ্টি, তাই লোকছড়া। আর আধুনিক যুগে লেখকদের রচিত ছড়াই আধুনিক ছড়া। কত্তো সহজ সংজ্ঞা ! আসলে কি তাই ? আধুনিক যুগের কোন লেখক যদি নিজেকে অজ্ঞাত রেখে কোন মৌখিক সৃষ্ট ছড়া বাজারে ছেড়ে দেন, তাহলে কি তা লোকছড়া হয়ে যাবে ? এমন নির্বোধ প্রশ্নের পেছনেই আসলে লুক্কায়িত রয়েছে লোকছড়ার প্রকৃত রূপবিচার। অতএব আমাদেরকে এবার আরেকটু পেছনে যেতেই হয়।

শব্দটা ‘ছড়া’ না হয়ে অন্য কিছুও তো হতে পারতো। কিন্তু অন্য কিছু না হয়ে কেন ছড়া হলো, অর্থাৎ ‘ছড়া’ শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়েই বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যে মতপার্থক্য দেখা গেল তার সুরাহা আজও হয়নি। কেউ বলেন এটা সংস্কৃতমূল শব্দ, কেউ বলেন দেশজ। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তো তাঁর ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ গ্রন্থে ‘ছড়া’ শব্দের দীর্ঘ বিবর্তনকে রীতিমতো সংজ্ঞায়িত করে ফেলেছেন এভাবে-

সং. ছটা > প্রা. ছডা > প্রা.ম. ছিটা > ছড়া

পণ্ডিতদের মধ্যে রাজশেখর বসু (চলন্তিকা অভিধান), যোগেশচন্দ্র রায় (বাঙ্গালা শব্দকোষ) প্রমুখ তাঁকেই সমর্থন করছেন। কিন্তু নগেন্দ্রনাথ বসু (বিশ্বকোষ) আবার কিছুতেই তা মানতে নারাজ। তাঁর মতে ‘ছড়া’ শব্দটি সম্পূর্ণ দেশজ। তার পালে হাওয়া লাগিয়েছেন আরেক পণ্ডিত সুকুমার সেন। তবে উনবিংশ শতাব্দির পূর্বে যে ছড়া শব্দটি বর্তমান অর্থ বহন করতো না এবং আধুনিক যুগে এসে এর অর্থগত বিবর্তন ঘটেছে তা মেনে নিয়ে শব্দের ব্যুৎপত্তিগত এই মত-ঠেলাঠেলি বাদ দিয়ে আমরা বরং ছড়ার সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যবিচারের দিকেই নজর দিতে পারি।

উনিশ শতকের শেষে এসে ছড়া সম্পর্কিত তাত্ত্বিক ও তথ্যমূলক আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু গত এক শতাব্দিকাল জুড়ে বিশেষজ্ঞদের মত প্রতিমত ও মতামতের বিস্তর চালাচালি হলেও ছড়ার কোন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা আদৌ সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবু প্রত্যক্ষভাবে সংজ্ঞা প্রদান করা না হলেও ওইসব আলোচনাগুলোতে ছড়ার বৈশিষ্ট্য নিয়ে যেসব চিন্তা ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে তাই আমাদেরকে ছড়ার রূপবিচারে আগ্রহী করে তোলে। অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ের মতোই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই এক্ষেত্রে আমাদের অগ্রণী পুরুষ। তাঁর হাত দিয়েই বাংলা লোকছড়ার সংগ্রহ শুরু হয় এবং তিনিই এই লোকছড়াকে সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রথম প্রকাশের উদ্যোগ নেন। পাশাপাশি এগুলোকে ছেলে-ভুলানো ছড়া বা মেয়েলি ছড়া নামে অভিহিত করে এ সম্পর্কিত আলোচনারও সূত্রপাত ঘটান তিনি।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে ৫সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ এর একটি পত্র-বিচিত্রায় উল্লেখ করেন- ‘...ছড়া’র একটা স্বতন্ত্র রাজ্য আছে, সেখানে কোনো আইন কানুন নেই- মেঘরাজ্যের মতো।...’

আসলেই কি তাই ? রবীন্দ্রনাথেরই সংগৃহীত একটি লোকছড়া শুনি আমরা।

‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদী এলো বান।
শিব ঠাকুরের বিয়ে হল, তিন কন্যে দান।
এক কন্যে রাঁধেন বাড়েন, এক কন্যে খান।
এক কন্যে না খেয়ে বাপের বাড়ি যান।।’

এখানে উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে এই লোকছড়াটি কিঞ্চিৎ পরিবর্তিতরূপে শিশুপাঠ্যে অন্তর্ভূক্ত হয়। ‘নদী’ শব্দের জায়গায় ‘নদে’ এবং ‘না খেয়ে’ শব্দযুগল হয়ে যায় ‘রাগ করে’। এতে অবশ্য ছড়ার অর্থগত বা চিত্রগত কোন ব্যাঘাত ঘটে না। তবে রবীন্দ্রনাথের ‘কোনো আইন কানুন নেই’ কথাটি বোধ করি আমাদের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি তৈরি করে দেয়। কাল্পনিক কোনো টাইম মেশিনে চড়ে যদি এ মুহূর্তে কয়েকশ’ বছর পেছনে চলে যাই তাহলে কী দেখবো আমরা ? টাপুর টুপুর বৃষ্টিঝরা বর্ষায় নদীতে যে প্লাবন নামে তাতে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম পায়ে হাঁটা পথগুলো চারদিকের থৈ থৈ বর্ষায় তলিয়ে গেলে যোগাযোগের একমাত্র ও সর্বত্রগামী মাধ্যম নৌ চলাচলই হয়ে উঠে সহজলভ্য। মাঠ-ঘাট পানিতে তলিয়ে গিয়ে মানুষগুলো যখন পরিপূর্ণ বেকার হয়ে উঠে, বসে বসে খাওয়া আর পুঁথি-পাঁচালির আসর, গান বাজনা এসব বিনোদনে নিজেদের ডুবিয়ে দেয়া ছাড়া আর কী করার থাকে এদের। শুরু হয়ে যায় সামাজিক অন্যান্য পার্বন উৎসবও। এবং তখনই আমাদের প্রাচীন গ্রাম-বাংলায় এই দীর্ঘ কর্ম অবসরে বিয়ে-বাদ্যিরও ধুম লেগে যায়। অতএব শিব ঠাকুরের বিয়ের মৌসুম যে এটাই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য সমাজে যে বহুবিবাহের চল খুব জোরেশোরেই ছিলো এটাও স্বীকৃত। তাছাড়া মেয়ে আইবুড়ো হওয়ার আগেই কন্যাদান সম্পন্ন না হলে যে ব্রহ্মপাপ ঘনিয়ে আসে তাতে একত্রে তিন কন্যা একপাত্রে দান করা ছাড়া কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার গতিই বা কী ! বর্ণহিন্দু সমাজের এই শাস্ত্রীয় কূপমণ্ডুকতাকে দুটোমাত্র চিত্রকল্পিত শ্লেষযুক্ত বাক্যের অটুট বাঁধনে যে লোককবি এতো চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, তাতে আইন-কানুনের ব্যত্যয় কি চোখে পড়ে কোথাও ? শাস্ত্র রক্ষার্থে তিনকন্যে যখন তিন সতীন হয়ে উঠে, আবহমান বাঙালি সমাজে এর কী দুঃসহ ফলাফল প্রতিফলিত হতে থাকে তাও সেই লোককবি পরবর্তী দুটি বাক্যের অনিবার্য চিত্রকল্প এঁকে ঠিকই বুঝিয়ে দেন গোটা সামাজিক চিত্রের বিশদ রূপ। প্রতিটা শব্দে শব্দে বিশদভাবে ভাবলে আমাদেরকে যে কাব্যের নিয়ম-কানুন ভুলে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে হয় তা অস্বীকার করি কী করে ! সে ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ এটাকে ছেলেভুলানো ছড়া বলতেই পারেন। তবে আমাদেরকে এটাও ভুলে গেলে চলে না যে, শাস্ত্রের কলা বিচার কি এইসব প্রাচীন লোকছড়ার আগে চালু হয়েছে, না কি পরে ?

১৩০১ বঙ্গাব্দে তাঁর ‘লোকসাহিত্য’ রচনায় ‘ছেলেভুলানো ছড়া-১’ পর্বে তিনি বলেন- ‘...ছড়াগুলিও শিশু-সাহিত্য, তাহারা মানবমনে আপনি জন্মিয়াছে।... ইহার মধ্যে ভাবের পরস্পর সম্বন্ধ নাই,... কতকগুলি অসংলগ্ন ছবি নিতান্ত সামান্য প্রসঙ্গসূত্র অবলম্বন করিয়া উপস্থিত হইয়াছে।... গাম্ভীর্য নয়, অর্থের মারপ্যাঁচ নয়, সুরময় ধ্বনিই ছড়ার প্রাণ।... ছড়াও কলাবিচারশাস্ত্রের বাহির, মেঘবিজ্ঞানও শাস্ত্রনিয়মের মধ্যে ভালো করিয়া ধরা দেয় নাই।... এবং ছড়াগুলিও ভারহীনতা অর্থবন্ধনশূন্যতা এবং চিত্রবৈচিত্র্য-বশতই চিরকাল ধরিয়া শিশুদের মনোরঞ্জন করিয়া আসিতেছে- শিশুমনোবিজ্ঞানের কোনো সূত্র সম্মুখে ধরিয়া রচিত হয় নাই।...’
সাহিত্য যখনো তার লেখ্যরূপ পায়নি, মুখে মুখে রচিত শ্লোক, গান বা ছড়াই যখন সকল সামাজিক কর্মকাণ্ডের শ্রুতিমাধ্যম হয়ে বহমান, আধুনিক শাস্ত্রবিচারিক পণ্ডিতদের আবির্ভাব নিশ্চয় এর পূর্বে ঘটে নাই ! বরং লোকায়ত সাহিত্য থেকেই যে পরবর্তী কলাশাস্ত্রের উদ্ভব, তা কি আমরা ধারণা থেকে বলতে পারি না ? সে ক্ষেত্রে আমাদের অজ্ঞাত সেই সব লোককবিদের সৃজনশীল প্রয়াসকেই আমরা শাস্ত্রসূত্রের লোকায়তিক উৎস হিসেবে ধরে নিয়ে ঐতিহ্যিক আবর্তনটাকে উপলদ্ধির রসবিচারে সিঞ্চিত করে নিতে পারি না ? তবে এটা ঠিক যে মানুষের বিচারবোধ তার সমকালীন জ্ঞান ও ভাবনার দ্বারাই প্রভাবিত ও প্রয়োগযোগ্য হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ যে তাঁর সমকালীন বিচার ও বিশ্লেষণবোধের নিক্তি দিয়েই সংগৃহীত লোকছড়াগুলোকে যাচাই বাছাইয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন তা আমাদেরকে মেনে নিতেই হয়। এবং সাহিত্য বিচারে এটাই স্বাভাবিক।

‘ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি আমার বাড়ি এসো।
শেজ নেই, মাদুর নেই, পুঁটুর চোখে বোসো।।
বাটা ভরে পান দেব, গাল ভরে খেয়ো।
খিড়কি দুয়ার খুলে দেব, ফুড়ুৎ করে যেয়ো।।

১৩০১-১৩০২ বঙ্গাব্দে ‘ছেলেভুলানো ছড়া-২’ পর্বে রবীন্দ্রনাথ বলেন- ‘আমাদের অলংকারশাস্ত্রে নয় রসের উল্লেখ আছে, কিন্তু ছেলেভুলানো ছড়ার মধ্যে যে রসটি পাওয়া যায়, তাহা শাস্ত্রোক্ত কোনো রসের অন্তর্গত নহে।... ছেলে ভুলানো ছড়ার মধ্যে তেমনি একটি আদিম সৌকুমার্য আছে- সেই মাধুর্যটিকে বাল্যরস নাম দেওয়া যাইতে পারে। তাহা তীব্র নহে, গাঢ় নহে, তাহা অত্যন্ত স্নিগ্ধ সরস এবং যুক্তি-সংগতিহীন।’

রবীন্দ্রনাথ কথিত অলংকারশাস্ত্রের এই নয়টি রস হচ্ছে শৃঙ্গার বা আদিরস, বীররস, রৌদ্ররস, হাস্যরস, করুণরস, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত এবং শান্তরস। রস তো আর এমনি এমনি টস টস করে না ! তার পেছনে নয়টি স্থায়ী ভাব রয়েছে বলে পণ্ডিত-মহলে স্বীকৃত। ভাব থেকেই রসের উৎপত্তি। রতি স্থায়ী ভাব থেকে শৃঙ্গার বা আদিরস, উৎসাহ থেকে বীররস, ক্রোধ থেকে রৌদ্ররস, হাস থেকে হাস্যরস, শোকভাব থেকে করুণরস, ভয় থেকে ভয়ানক, জুগুপ্সা থেকে বীভৎস, বিস্ময় থেকে অদ্ভুত এবং শম স্থায়ী ভাব থেকে শান্তরস। রসশাস্ত্র অনুসারে এই নয়টি স্থায়ী ভাব নাট্য বা কাব্যে বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের সংযোগে নয়টি রসে সার্থক পরিণতি লাভ করে।

আমাদের সহজ সরল অশিক্ষিত লোককবিরা দুহাজার বছরের পুরনো সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্র অধ্যয়ন ও বুৎপত্তিলাভ করে অবশেষে মুখে মুখে ছড়া কাটতে শুরু করেছিলেন বললে বক্তাকে যে পাগলা-গারদের লোহার গরাদে পুরে দিতে দেরি হবে না সেখানে বোধ করি কারোরই সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু পণ্ডিতজনদের এমন পিলে চমকানো গবেষণা কি আর থেমে থাকে তাতে ? তাই রবীন্দ্রনাথের উপরে উদ্ধৃত ভাষ্যকে সর্বতোভাবে মেনে নেয়ার আগে তাঁরই সংগ্রহ থেকে আরেকটি ছড়া শুনে নেই আমরা-

কে মেরেছে, কে ধরেছে সোনার গতরে।
আধ কাঠা চাল দেব গালের ভিতরে।।
কে মেরেছে, কে ধরেছে, কে দিয়েছে গাল।
তার সঙ্গে গোসা করে ভাত খাওনি কাল।।
কে মেরেছে, কে ধরেছে, কে দিয়েছে গাল।
তার সঙ্গে কোঁদল করে আসব আমি কাল।।
মারি নাইকো, ধরি নাইকো, বলি নাইকো দূর।
সবেমাত্র বলেছি গোপাল চরাও গে বাছুর।।

অথবা রবীন্দ্রনাথের নিজের রচনাকৃত একটা ছড়াও শুনে নিতে পারি আমরা-

ভোলানাথ লিখেছিল তিন চারে নব্বই
গণিতের মার্কায় কাটা গেল সর্ব্বই।
তিন চারে বারো হয় মাস্টার তারে কয়
লিখেছিনু ঢের বেশি এই তার গর্বই।

এসব রচনায় শুধুই কি বাল্যরস, না কি অন্য কোন রসও রয়েছে তা বিজ্ঞ গবেষকদের জন্যই থাক।

১৩৪১ বঙ্গাব্দে ‘ছন্দ’ রচনার পদ্যছন্দ বিষয়ক এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন- ‘...যতিকে কেবল বিরতির স্থান না দিয়ে তাকে পূর্তির কাজে লাগাবার অভ্যাস আরম্ভ হয়েছে আমাদের ছড়ার ছন্দ থেকে। ছড়া আবৃত্তি করবার সময় আপনি যতির যোগান দেয় আমাদের মনে।...ছড়ার রীতি এই যে, সে কিছু ধ্বনি জোগায় নিজে, কিছু আদায় করে কণ্ঠের কাছ থেকে; এ দুইয়ের মিলনে সে হয় পূর্ণ।...’
আশ্বিন ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে ‘ছড়ার ছবি’ রচনায় রবীন্দ্রনাথ বলেন- ‘...ছড়ার ছন্দ প্রাকৃত ভাষার ঘরাও ছন্দ।...এর ভঙ্গীতে এর সজ্জায় কাব্য সৌন্দর্য সহজে প্রবেশ করে, কিন্তু সে অজ্ঞাতসারে। এই ছড়ায় গভীর কথা হালকা চালে পায়ে নূপুর বাজিয়ে চলে, গাম্ভীর্যের গুমোর রাখে না।... ছড়ার ছন্দকে চেহারা দিয়েছে প্রাকৃত বাংলা শব্দের চেহারা।... বাংলা প্রাকৃত ভাষায় হসন্ত-প্রধান ধ্বনিতে ফাঁক বুজিয়ে শব্দগুলিকে নিবিড় করে দেয়।

কবিগুরুর সাথে দ্বিমত থাকলেও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের এইসব প্রণিধানযোগ্য মন্তব্যগুলো থেকে গবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ তাঁর গবেষণা-সন্দর্ভ ‘ছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে রবীন্দ্র-ভাবনায় ছড়াসম্পর্কিত বৈশিষ্ট্যের যে নির্যাস দাঁড় করান তা হচ্ছে: (১) ছড়া নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের অধীন নয়, (২) ছড়ায় ভাব পরস্পর সম্বন্ধহীন ও যুক্তিসঙ্গতিবিহীন, (৩) ছড়ার চিত্র অসংলগ্ন, (৪) অর্থবোধের চেয়ে সুরময় ধ্বনিই ছড়ার প্রাণস্বরূপ, (৫) ছড়া কলাবিচার-শাস্ত্র কিংবা শাস্ত্রীয় রসে বিচার্য নয়, (৬) ছড়ায় যতির ভূমিকা শুধু বিরতির জন্য নয় এবং (৭) ছড়ার ছন্দ প্রাকৃত ভাষার ছন্দ এবং শব্দও প্রাকৃত।

উল্লেখ্য, এগুলো ছড়ার জন্য স্বতসিদ্ধ কোন নির্ধারণসূত্র নয়। রবীন্দ্রভাবনায় ছড়ার বৈশিষ্ট্য। যেহেতু লোকায়ত ছড়াগুলোর আদ্যান্ত পাঠ করেই আমাদেরকে পরবর্তীকালের আধুনিক ছড়ার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে হয়, তাই লোকছড়াভিত্তিক আমাদের রথি-মহারথিদের আলোচনাগুলোকে বিবেচনায় নিয়েই আমাদেরকে প্রশ্ন উত্থাপনের পরবর্তীধাপে পা রাখতে হয়। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের দ্বারস্থ তো হতেই হয়। আলোচনা যখন ছড়া নিয়ে, রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি যোগীন্দ্রনাথের নাম তো অনিবার্যভাবেই এসে পড়ে। কিন্তু তিনি আবার এসব তর্ক-বিতর্কে না জড়িয়ে ছড়া সংগ্রহ ও রচনার মধ্য দিয়েই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন।

আতা গাছে তোতা পাখি
ডালিম গাছে মউ,
কথা কও না কেন বউ ?
কথা কব কী ছলে,
কথা কইতে গা জ্বলে !
--(তোতা পাখি/ খুকুমণির ছড়া)

যোগীন্দ্রনাথ কর্তৃক সংগৃহীত এই লোকছড়াটিই পরবর্তীকালে আমাদের দেশের শিশু পাঠ্যে যে বিবর্তিত রূপ নিয়ে পঠিত হতে থাকে, তা হচ্ছে এরকম-

আতা গাছে তোতা পাখি
ডালিম গাছে মৌ,
এত ডাকি তবু কথা
কও না কেন বৌ !

সেই যোগীন্দ্রনাথ সরকার কর্তৃক সংগৃহীত ও ১৩০৬ বঙ্গাব্দে লোকছড়ার প্রথম সংকলিত গ্রন্থ ‘খুকুমণির ছড়া’র ১ম সংস্করণের ভূমিকায় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বলেন- ‘...বয়স্ক মানবের চরিত্র বিভিন্ন দেশে বিভিন্নরূপ।...কিন্তু শিশু-চরিত্র বোধ করি সর্বদেশেই ও সর্বকালেই একরূপ।... মানব-শিশু যখন সূতিকাগার হইতে প্রথম বাহির হইয়া সংসারের সহিত পরিচয় আরম্ভ করে, তখন শাদা চামড়া ও কাল চামড়া উভয়েরই অভ্যন্তরে ঠিক একজাতীয় বুদ্ধিবৃত্তি বর্তমান থাকে। যাঁহাদের অবকাশ আছে, তাঁহারা বাঙ্গালীর ছেলের ‘ছড়া’ ও ইংরেজের ছেলের ‘নার্শারী গান’ মিলাইয়া দেখিবেন, উভয়ের মধ্যে কি অদ্ভুত রকমের সৌসাদৃশ্য বর্তমান।... কেবল শিশু-প্রকৃতি কেন, বয়স্ক মনুষ্যের প্রকৃতিতেও যে অংশটুকু মানবজাতির সাধারণ, তাহারও পরিচয় এই বিভিন্ন দেশের ছড়া-সাহিত্যে সুস্পষ্ট পাওয়া যাইবে।...
...বাঙ্গালীর শিশুসাহিত্য বা ছড়া সাহিত্য, যাহা লোকমুখে প্রচারিত হইয়া যুগ ব্যাপিয়া আপন অস্তিত্ব বজায় রাখিয়াছে, কখন লিপিশিল্পের যোগ্য বিষয় বলিয়া বিবেচিত হয় নাই, সেই সাহিত্য সর্বতোভাবে অতুলনীয়।...’

অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী ছড়ার অভিন্ন রূপ এবং মানবজাতির নৃতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বা মনস্তাত্ত্বিক সাযুজ্যের কারণে আবহমান লোকছড়ার মধ্যেও এই মিল বা অভিন্নতা দেখা যায়। এবং এই লোকছড়া উচ্চমানের অতুলনীয় সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত। অতএব, প্রসঙ্গটা যখন এবার সাহিত্যের মধ্যেই নাক গলিয়ে দেয়, তখন আর এইসব ছড়ার সাহিত্যকীর্তি হিসেবে বিচার-বিশ্লেষণই বা বাদ থাকে কী করে ! রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে এবার ছন্দবিশারদরাও ঝাঁপিয়ে পড়লেন নিক্তি-পাল্লা নিয়ে।

১৩৪৮ বঙ্গাব্দে মোহিতলাল মজুমদার তাঁর ‘বাংলা কবিতার ছন্দ’ গ্রন্থে ছড়ার ছন্দ নিয়ে বৈশিষ্ট্যময় মন্তব্য করেন- ‘এই ছন্দের সাধারণ রূপটির প্রধান উপাদান দুইটি-
১. ইহার ধ্বনিস্থানের সংখ্যা সর্বদাই চার,এবং
২. আদ্য বর্ণের ঝোঁকটিকে সমৃদ্ধ করিবার জন্য ধ্বনিস্থানের উপযুক্ত অবকাশে হসন্তের সন্নিবেশ।’


চৌধ্ রী বাড়ির মৌধ্ রি পিঠা,
গয়লা বাড়ির দই;
সকল চৌধ্ রী খেইতে বৈছে,
বুড়া চৌধ্ রী কই ?
বুড়া চৌধ্ রী গাই দুয়ায়,
গাইয়ে দিল লাথ;
সকল চৌধ্ রী মইরা গেল
শনিবারের রাইত্ !
--(চৌধ্ রী / খুকুমণির ছড়া)

আবার সুকুমার সেনের মতে ছড়াই সর্বকালের আদিম কবিতার বীজ। ‘বিচিত্র সাহিত্য’ গ্রন্থে ‘লোকসাহিত্য’ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সুকুমার সেন বলেন- ‘...লোকসাহিত্যের যে শাখাটি অন্তপুরের আঙিনায় স্নিগ্ধ ছায়া বিস্তার করেছে তা ঘুমপাড়ানি ও ছেলেভুলানো ছড়া। এই ছড়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সর্বদেশের সর্বকালের আদিম কবিতার বীজ, বাণীর প্রথম অঙ্কুর। আদি মানবজননীর কণ্ঠের অর্থহীন ছড়ার টানা সুর ছন্দের জন্ম দিয়েছে।... ছেলেভুলানো ছড়া কবিতাই। তবে তার নির্মাণরীতি সাধারণ কবিতার থেকে আলাদা। সাধারণ কবিতা লেখবার সময় কবির কল্পনা বিচরণ করে ভাব থেকে রূপে, রস থেকে ভাষায়। ছড়া কবিতায় লেখকের কল্পনা যায় রূপ থেকে ভাবে, ভাষা থেকে রসে, এবং তাতে রূপের ও ভাবের মধ্যে, ভাষা ও রসের সঙ্গে কোন রীতিসিদ্ধ যোগাযোগ বা সঙ্গতি আবশ্যিক নয়।...’
মোদ্দা কথা, রসবিচার শাস্ত্রিকরাও এবার চিপেচিবড়ে রস বের না করে আর ছড়াকে ছাড়ছেন না। এদিকে মুহম্মদ আবদুল হাই তো মনে করেন সমগ্র মধ্যযুগে ধর্মীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে সত্যিকার সাহিত্যশাখা হলো ছড়া। ১৩৫১ বঙ্গাব্দে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত ‘সওগাত’ পত্রিকার ২৬ বর্ষ ১২ সংখ্যায় তিনি তার মতামত এভাবে তুলে ধরেন- ‘...মধ্যযুগের কাব্য-সাহিত্যের আলোচনাক্রমে সেই যুগের বৈশিষ্ট্যবর্জ্জিত অথচ প্রকৃত সাহিত্যের উপাদান সমন্বিত একটি সাহিত্য-শাখার নাম করা যাইতে পারে- তাহা, ছড়া ও গ্রাম্যগীতিকা।’

তাহলে বুঝুন এবার ঠেলা ! সাহিত্যে লেটার মার্ক নিয়ে দৌঁড়ে এগিয়ে থাকা ছড়াকে আর পায় কে ! ফলে ছড়া নিয়ে যে ঔৎসুক্য দেখা দিলো, তাতে করেই লোকায়ত ছড়া থেকে প্রাণশক্তি আহরণ করে আমাদের আধুনিক ছড়ার ধারাটাও চলিষ্ণু হয়ে উঠলো এবার। ছড়ার বই প্রকাশ দেরিতে হলেও ছড়ার রচনাকাল বিচারে যোগীন্দ্রনাথ সরকারই বাংলা আধুনিক ছড়ার অগ্রপুরুষ হিসেবে স্বীকৃত।

...ওই তো ওখানে/ ঘুড়ি ধরে টানে,/ ঘোষেদের ননী;
আমি যদি পাই,/ তা হলে উড়াই/ আকাশে এখনি !
দাদখানি তেল,/ ডিম-ভরা বেল,/ দুটা পাকা দৈ,
সরিষার চাল,/ চিনি-পাতা ডাল,/ মুসুরির কৈ !...

...এসেছি দোকানে-/কিনি এই খানে,/ যত কিছু পাই;
মা যাহা বলেছে,/ ঠিক মনে আছে,/ তাতে ভুল নাই !
দাদখানি বেল,/ মুসুরির তেল,/ সরিষার কৈ,
চিনি-পাতা চাল,/ দুটা পাকা ডাল,/ ডিম-ভরা দৈ।
--(কাজের ছেলে/যোগীন্দ্রনাথ সরকার)

ছড়া সম্পর্কে একেবারে অনভিজ্ঞ আমাদের চোখে উপরে উদ্ধৃত রচনাটিকে কেউ যদি ছড়া বলে স্বীকার না করেন, তাহলে হয়তো কোমর বেঁধে এখনি ঝগড়া করতে লেগে যেতে প্রস্তুত হয়ে আছি আমরা। ইস্কুলপাঠ্যে মুখস্থও করে এসেছি, অনেকটা না বুঝেই। কিন্তু আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতো পরবর্তী আরো পণ্ডিতজনেরা যখন স্পষ্ট করে দেন যে, ছড়ার বৈশিষ্ট্যের অন্যতম শর্ত হলো...ছড়া কবিতার মতো দীর্ঘ না হওয়াই নিয়ম;... , বা ...ছড়া হবে বাহুল্যবর্জিত, দৃঢ়বদ্ধ ও সংক্ষিপ্ত,... তখন কি আমরা বিভ্রান্ত না হয়ে পারি ? সে ক্ষেত্রে উপরোক্ত তিন স্তবক ও ছত্রিশ পঙক্তিতে বিন্যস্ত ‘কাজের ছেলে’ রচনাটি কি এক কথায় ছড়া থেকে খারিজ হয়ে যায় না ! একইভাবে তাঁর ‘মজার দেশ’, ‘কাকাতুয়া’ ইত্যাদি রচনাগুলোর মতো আরো কতকগুলো রচনা খারিজ করে দিয়ে এই খারিজের দৃষ্টান্ত অন্যদের মধ্য থেকে টানতে থাকলে খারিজ তালিকা যে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠতে থাকবে, তা হজমের সামর্থ কি আছে আমাদের ? না থাকলে তা বোধ করি আমাদেরকে এবার আয়ত্তে আনতেই হবে। কেননা লোকছড়ার সাথে আধুনিক ছড়ার যে বিরোধের সূত্রপাত শুরুতেই পেয়ে যাই আমরা তার কোন সুরাহা এখনো হয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। নইলে এই খড়গ-হস্ত থেকে রবীন্দ্রনাথও রেহাই পান না কিছুতেই। যদিও বিশাল সাহিত্যকৃতির বিপুল ভাণ্ডারে অন্য সবদিকে রবীন্দ্রনাথকে আমরা অবসিংবাদিতভাবে পেলেও ছড়াকার হিসেবে তাঁকে আমরা খুব একটা সার্থকভাবে আবিষ্কার করতে পারি না।

তাঁদের সমসাময়িক ও পরবর্তী গঠনকালে আধুনিক ছড়া রচনায় আরো অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। তাদের মধ্যে উপেন্দ্রকিশোর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, সুকুমার রায়, গুরুসদয় দত্ত, সুনির্মল বসু, অন্নদাশঙ্কর রায় অন্যতম হলেও একমাত্র সুকুমার রায় ছাড়া আর কাউকেই আধুনিক ছড়া সাহিত্যের আদর্শ হিসেবে অনিবার্য প্রভাব নিয়ে রাজত্ব করতে দেখি না আমরা। সুকুমার তাঁর ছড়ায় যে হাস্যরস, স্যাটায়ার, হিউমার, ননসেন্স ইমেজ দিয়ে এক বিদ্রুপাত্মক কৌতুকময় জগৎ গড়ে তুলেন, ছড়া সাহিত্যে সুকুমার ঘরাণা হিসেবেই তা প্রতিষ্ঠিত হয়ে দাপটের সাথে এখনো রাজত্ব করে যাচ্ছে।

সব লিখেছে এই কেতাবে দুনিয়ার সব খবর যত
সরকারী সব অফিসখানার কোন্ সাহেবের কদর কত।
কেমন ক’রে চাটনি বানায়, কেমন ক’রে পোলাও করে,
হরেক রকম মুষ্টিযোগের বিধান লিখছে ফলাও ক’রে।
সাবান কালি দাঁতের মাজন বানাবার সব কায়দাকেতা,
পূজা পার্বণ তিথির হিসাব শ্রাদ্ধবিধি লিখছে হেথা।
সব লিখেছে, কেবল দেখ পাচ্ছিনেকো লেখা কোথায়-
পাগলা ষাঁড়ে করলে তাড়া কেমন ক’রে ঠেকাব তায়।
--(কি মুস্কিল!/আবোল তাবোল/সুকুমার রায়)

মাত্র ছত্রিশ বছরের স্বল্পায়ুর কারণেই কিনা জানি না, সুকুমার রায়কে ছড়া সম্পর্কিত তাত্ত্বিক কোনো আলোচনায় আমরা পাই না। অন্যদিকে দীর্ঘায়ু হবার কারণেই হয়তো ছড়াকার হিসেবে সার্থকতা না পেলেও অন্নদাশঙ্কর রায়কে নিরেট তাত্ত্বিক আলোচনায় উঠে আসতে দেখি আমরা।

অন্নদাশঙ্কর রায় যখন তাঁর সমাজতত্ত্ব নিয়ে আবির্ভূত হন ছড়া-আলোচনায়, তখন তিনি আর ছড়ার লোকায়ত পর্যায়ে নেই। সরাসরি চলে এসেছেন আধুনিক ছড়ার উঠোনে। অর্থাৎ আলোচনার একটা পর্যায়ে এসে আমাদের পণ্ডিত ব্যক্তিগণ লোকায়ত ছড়াগুলো কীভাবে রচিত হয়েছে তার নমূনা মাথায় রেখে আধুনিক ছড়া কীভাবে লিখিত হওয়া উচিৎ এই প্রাসঙ্গিক আলোচনায়ও নিজেদের সম্প্রসারিত করে দেন। অর্থাৎ ছড়ার বৈশিষ্ট্য কী এবং কী হওয়া উচিৎ, এ বিষয়টা তাঁদের মাথায় জেঁকে বসে গেছে। তাঁর মতে ছড়া রচনা হওয়া উচিৎ শ্রমজীবী মানুষ এবং নিষ্পাপ শিশুদের জন্য জনসাহিত্য হিসেবে। রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও ছড়ার ক্ষেত্রে ধ্বনি, মেজাজ, রস, অসংলগ্নতা, চিত্রময়তা ও মিলের ওপর জোর দেন। এছাড়াও তিনি ইমেজ, ফান, আর্ট, আনইভেন্নেস, আকস্মিকতা, যুক্তাক্ষর বর্জন প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্য যুক্ত করে ছড়াতত্ত্বে রীতিমতো নতুন মাত্রা সংযোজন করতে উদ্যোগী হন। ‘উড়কী ধানের মুড়কী’ গ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকায় তিনি বলেন- ‘...ছড়া লেখার উপকরণ আসে সমসাময়িক ঘটনা বা পরিস্থিতি থেকে।...’

তেলের শিশি ভাঙলো বলে
খুকুর ’পরে রাগ করো,
তোমরা সবাই বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো
তার বেলা ?
--(অন্নদাশঙ্কর রায়)

এখলাসউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ‘ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ’-এ ছড়ার রূপবিচার করতে গিয়ে অন্নদাশঙ্কর তাঁর মতামতটা তুলে ধরেন এভাবে- ‘...পুরাতন ছড়া যেন একটা ভাঙ্গা আয়নার জোড়া দেওয়া এক রাশ টুকরো। একটাকে আরেকটার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপায় নেই। কতকগুলি টুকরো বেমালুম হারিয়ে গেছে। কতকগুলিকে ভুল জায়গায় বসানো হয়েছে। সেই জন্যে সেই আয়না দিয়ে আমরা অতীতের মুখ দেখতে পাচ্ছিনে। পাচ্ছি একরাশ ইমেজ। কিন্তু ধ্বনি মোটামুটি ঠিকই আছে।
ছড়া মুখে মুখে কাটবার জিনিস, লেখনীমুখে রচনা করবার জিনিস নয়। লেখনি তাকে ধরে রাখতে পারে, কিন্তু চোখ দিয়ে পড়ার জন্যে নয়, কান দিয়ে শোনার জন্য। কান যদি বলে, এ ছড়া নয়, তবে এ ছড়া নয়। এ পদ্য।...’

অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে অন্নদাশঙ্কর নিজেও ছড়ার নাম দিয়ে দীর্ঘ বেয়াল্লিশ চরণের পদ্য লেখা থেকে নিজেকে নিবৃত রাখতে পারেন নি !

গোরা কবর ! ফাঁসি-দিয়া বর
চহটার ঘাট ! কটক নগর !

‘বর’ মানে বট, সেই গাছে জানো
গতযুগে হতো ফাঁসি লটকানো
গোরাদের ওই গোরস্থানেও
ভয় হানা দেয় কালার প্রাণেও।...

...রাত কেটে যায় গোরুর গাড়ীতে
বেলা বয়ে যায় নদী পাড়ি দিতে।
কী বিশাল নদী ! মাঝখানে চর
নাও থেকে নেমে হাঁটি বরাবর।...
--(মামার বাড়ী যাওয়া/ ছোটদের ছড়া/ অন্নদাশঙ্কর রায়)

কলকাতা থেকে মার্চ ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ধীমান দাশগুপ্ত সম্পাদিত সংকলন ‘একশো ছড়া’এ ছড়া বিষয়ে অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্পষ্টোক্তি- ‘... কবিতার মতো ছড়ার নির্দিষ্ট নিয়ম নেই, ছড়া বানাবার। ছড়া হয় আকস্মিক, ইররেগুলার। সেখানে আর্ট আছে, আরটিফিসিয়ালিটির স্থান নেই।
ছড়া হবে ইররেগুলার, হয়তো একটু আন্ ইভেন। বাকপটুতা, কারিকুরি নয়। কবিতা থেকে ছড়া আলাদা। ছড়াকে কবিতার মধ্যে ঢোকাতে গেলে কবিতাকে ব্যাপ্ত করে নিতে হয়। কবিতা তো যে কোনো ভাবেই হয়, যে কোনো ছন্দে, এমনকি গদ্যেও। ছড়ার কিন্তু একটাই ছন্দ, রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন ছড়ার ছন্দ, একটু দুলকি চালে চলে, শাস্ত্রসম্মত নামও একটা আছে তার। ছড়া ঐ ছন্দেই লেখা যায় শুধুই।... আর ছড়ার মিল। দু সিলেবল হবেই, তিন সিলেবল হলে আরও ভালো হয়। আর শেষে কোন যুক্তাক্ষর থাকবে না।...
ভাব ও ছন্দ তো থাকবেই, এ ছাড়াও ছড়ায় থাকবে ইমেজ ও মিল। ছড়ার ইমেজ মিল রেখে আসে না, পারম্পর্য কম।... ছড়া হলেই হালকা, সরস হবে তা কেন ? সব কিছু নিয়েই ছড়া হয়েছে, বীভৎস রস নিয়েও হয়েছে।...
আধুনিক ছড়ায় লোকছড়ায় কালেকটিভ সেন্সটা নেই।... আজ সীরিয়াস লোকেরাও ছড়া লিখছেন। ছড়ার মধ্যে সত্যি কিছু না থাকলে এটা হত না। তবে সব ছড়াই তো আর ছড়া নয়, বেশীর ভাগই পদ্য।’

তাঁর মতের সাথে কে কতটুকু একমত হবেন বা না হবেন সে ভিন্ন কথা। কিন্তু ছড়া নিয়ে অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতো এমন স্পষ্টোক্তি সম্ভবত খুব কম জনই এভাবে করেছেন। এক্ষেত্রে বাড়তি কোন মন্তব্য না করে তাঁরই অন্য একটি রচনা থেকে তাঁকে তাঁর কথা দিয়ে ছড়ার ছন্দটাকে মাত্রা বিচারে যাচাই করে নিতে পারি আমরা। সেক্ষেত্রে ছ’মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত পর্ব-অতিপর্বে বিভাজিত নিম্নোক্ত রচনাটিকে তাহলে কোন্ বিচারে আমরা পদ্য না বলে ছড়া বলবো ?

শুনহ ভোটার ভাই,
সবার উপরে আমিই সত্য
আমার উপরে নাই।
আমাকেই যদি ভোট দাও আর
আমি যদি হই রাজা
তোমার ভাগ্যে নিত্য ভোগ্য
মৎস্য মাংস খাজা।
শুনবে আমার নাম ?
আমি টুইডেলডাম।...
--(শুনহ ভোটার ভাই/ বড়োদের ছড়া/ অন্নদাশঙ্কর রায়)

ছড়া নিয়ে বৈশিষ্ট্যসূচক মন্তব্য ও আলোচনা আরো অনেকেই করেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছড়াকে চিত্রশিল্প ও সংগীত শিল্পের দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লোকসাহিত্য সংক্রান্ত বিভিন্ন রচনায় ছড়াকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিচারের জন্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মুহম্মদ এনামুল হক সুকুমার সেনের মতো ছড়ায় লোকসাহিত্যের প্রাচীন রূপের সন্ধান করেছেন। ডাক ও খনার বচন এবং মন্ত্রের সাথে ছড়ার পার্থক্য নির্দেশ করতে গিয়ে তিনি তাঁর ‘মণীষা-মঞ্জুষা’ গ্রন্থে মন্তব্য করেন যে, ...ছড়ায় উপদেশ নাই, চিত্র আছে। সৈয়দ আলী আহসান তাঁর ‘কবিতার কথা ও অন্যান্য বিবেচনা’ গ্রন্থে লোকসাহিত্য প্রসঙ্গে ছড়া-নির্মাণের পদ্ধতিকে অসচেতন প্রয়াস মনে করে মন্তব্য করেন যে, ‘... সচেতন বুদ্ধির কুশলতায় ছড়াগুলো নির্মিত হয়নি- এগুলো অপরিমিত অবকাশের আনন্দ সঞ্চয়।’ আর নীলরতন সেন ১৯৭৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সঞ্জীব সরকার সম্পাদিত ‘লোকায়ত সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিত ও রূপরেখা’ সংকলনে লোক কাব্যের ছন্দ বিষয়ে বলতে গিয়ে ছড়ার উচ্চারণ বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন- ‘...ছড়ায় আবৃত্তির সুর বা গীতের পঠন ভঙ্গি থাকায় তা ঝোঁকালো, সুরাশ্রয়ী এবং উচ্চারণে দ্রুত সংকোচন-বিবর্ধন মাত্রিক।... স্বভাব আবৃত্তির ব্যত্যয় এতে বাঞ্ছনীয় নয়।’

পুয়াপুড়ি ভুল্লাভুল্লি, যাওরে বারিয়া।
দামান কন্যা ঐ তো যায় বন্ধোর মাঝে দিয়া।।
আগে দামান পাছে কন্যা, তার পাছে বৈরাতি।
চলছৈন দেখা যায় যেমন আছে রীতি।।
দান জেহেজ বড় নায় ভোর ভারটি কম।
ভাবে বুঝলাম কন্যার বাপ কাটুয়ার যম।। (সিলেট)
--[সংগ্রহ: ওয়াকিল আহমদ]

তবে ছড়া নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বড় কাজটি করেন আশুতোষ ভট্টাচার্য। লোকছড়াকে প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণার বিষয় হিসেবে নিয়ে তিনি বাংলা ছড়াকে আন্তর্জাতিক ফোকলোর-চর্চার পদ্ধতিতে বিচারের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের ছড়ার সঙ্গে বাংলা ছড়ার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য বিচার করেন এবং ছড়ার সংজ্ঞা, ছন্দ, শব্দ-ব্যবহার প্রভৃতিও নির্দেশ করেন। লোকসাহিত্যের অন্যান্য শাখার সঙ্গে ছড়ার পার্থক্য, ছড়ার আঞ্চলিক পাঠান্তরের কারণ, ছড়ার কল্পনার জগৎ, ছড়া ও শিশু কবিতার পার্থক্য প্রভৃতি বিষয়েও তিনি নতুন উপাদান যুক্ত করেন। আশুতোষ ভট্টাচার্যের দীর্ঘসময়ে একাধিক গ্রন্থের সহস্রাধিক পৃষ্ঠায় আলোচিত ছড়া-তত্ত্বের মূল সূত্রসমূহকে গবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ তাঁর গবেষণা সন্দর্ভ ‘ছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে খুব সংপ্তিভাবে নিম্নরূপ তুলে ধরেন:

‘...যাহা মৌখিক আবৃত্তি করা হয়, তাহাই ছড়া, যাহা তাল ও সুর-সহ গান করা যায়, তাহাই সঙ্গীত।...ছড়ার সুর বৈচিত্র্যহীন, সঙ্গীতের সুর বৈচিত্র্যময়।...
...ছড়ায় কোন কাহিনীও থাকে না; ইহার মধ্যে যাহা থাকে, তাহাকে চিত্র বলিতে পারা যায়; কিন্তু সেই চিত্রও স্বয়ংসম্পূর্ণ নহে,...
...ছড়ার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, ইহার একটির অংশের সঙ্গে আর একটির অংশ অতি সহজেই জুড়িয়া যায়, তাহার ফলেই একই ছড়ার মধ্যে ভাব ও চিত্রগত বিভিন্নতা দেখিতে পাওয়া যায়। ছড়ার পদগুলি পরস্পর সুদৃঢ়ভাবে সংবদ্ধ নহে, বরং নিতান্ত অসংলগ্ন;...
...ছড়ার ছন্দের বিশিষ্ট লক্ষণ এই যে, ইহা শ্বাসাঘাত-প্রধান।...প্রতি পর্বের স্বর সংখ্যা গণনা করিয়া মাত্রার হিসাব পাওয়া যায় বলিয়া অনেকে ইহাকে স্বরমাত্রিক বা স্বরবৃত্ত ছন্দ বলেন। ইহার প্রত্যেক পর্বের আদিতে ঝোঁক পড়ে বলিয়া ইহাকে প্রাস্বরিক ছন্দ বা বল-প্রধান ছন্দও বলে; এতদ্ব্যতীত ইহা ছড়ার ছন্দ, লৌকিক ছন্দ, প্রাকৃত ছন্দ ইত্যাদি নামেও পরিচিত, তবে স্বরবৃত্ত নামটিই ইহার বহুল প্রচলিত।’
--[আশুতোষ ভট্টাচার্য। ‘বাংলার লোক-সাহিত্য’। ক্যালকাটা বুক হাউস, কলকাতা। ১৯৫৭।]


‘বাংলার ছড়াগুলির একটি প্রধান গুণ এই যে, লোক-সাহিত্যের অন্যান্য কোন কোন বিষয়ের মত ইহারা যে কেবল মাত্র আঞ্চলিক, অর্থাৎ একই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ, তাহা নহে, -অনুসন্ধানের ফলে দেখা গিয়াছে যে, এক একটি ছড়া যে কোন ভাবেই হোক, বাংলাদেশের এক প্রান্তে রচিত হইলেও কালক্রমে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত অনায়াসেই বিস্তার লাভ করিয়াছে। যে সকল সাংস্কৃতিক উপকরণ দ্বারা সমগ্র বাঙ্গালীর মধ্যে কালক্রমে একটি অখণ্ড ঐক্য সৃষ্টি হইয়াছে, ছড়া তাহাদের অন্যতম;... ইহার প্রধান কারণ, ছড়ার মধ্যে সহজ আনন্দের যে ভাবটি প্রকাশ পায়, তাহার একটি সার্বজনীন আবেদন থাকে। যেখানে তথ্য ও তত্ত্ব, সেখানেই বিশিষ্টতা; কিন্তু ছড়াগুলিতে যেমন কোন তথ্য নাই, তেমনই কোনও তত্ত্বও নাই;...’
--[আশুতোষ ভট্টাচার্য। ‘বাংলার লোক-সাহিত্য’, ২য় খণ্ড। ক্যালকাটা বুক হাউস। ১৩৬৯। ]


‘...ছড়ার মধ্যে শব্দ অপেক্ষা সুরের প্রয়োজন অধিক।...
...ছড়ায় অপরিচিত বিদেশী শব্দ কদাচ ব্যবহৃত হয় না। ছড়া শিশুর ভাষা, বিজ্ঞের ভাষা নহে;...
...শব্দের উচ্চারণ বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করিয়াই ছড়া প্রধানতঃ রচিত হয়, শব্দই ছড়ার প্রাণ-স্বরূপ, অর্থ ইহার গৌণ মাত্র।...
...বাস্তবে এবং কল্পনায় মিলিয়াই ছড়ার জগৎ গড়িয়া উঠে, কেবলমাত্র অবিমিশ্র বাস্তবও যেমন ইহাতে থাকে না, তেমনই অবিমিশ্র কল্পনার উপাদানেও ইহা সৃষ্টি হয় না। সাহিত্য মাত্রেরই ইহা স্বাভাবিক ধর্ম।...’
‘...ছড়ার মধ্যে যেমন চিত্রের অসংলগ্নতা দেখা যায়, ইহার আনুপূর্বিক বর্ণনার মধ্যেও তাহাই অনুভব করা যায়। কিন্তু চিত্রগুলি পরস্পর অসংলগ্ন হইলেও একটি অখণ্ড সুর ইহাদের মধ্য দিয়া প্রবহমান; ছড়ার ইহাই বৈশিষ্ট্য।’...
--[ আশুতোষ ভট্টাচার্য। ‘বাংলার লোক-সাহিত্য’, ২য় খণ্ড। ক্যালকাটা বুক হাউস। ১৩৬৯। ]


‘...ছড়া তাহার অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ পরিচয়ে লোক-সাহিত্যের অপরাপর শাখা হইতে স্বতন্ত্র। ইহারা স্বপ্নদর্শী মনের অনায়াস সৃষ্টি; ইহাদের শিল্পরূপও কোন ব্যক্তি কিংবা সমাজের সচেতন প্রতিভার সৃষ্টি নহে। ইহাদের মধ্যে বৈদগ্ধ অপেক্ষা স্বতঃস্ফূর্ত রসধারা, মস্তিস্ক অপেক্ষা হৃদয়ের স্থান অনেকখানি বেশী।...
...সকল শিশু-কবিতাই ছড়া নহে।
...শিশু-কবিতা আর সাহিত্যিক ছড়ায় পার্থক্য কোথায় ? কোন তৌল ব্যবহার করিয়া উভয়ের মধ্যকার দূরত্বটুকু জানিয়া লইব ? ছড়া এই শব্দটি শ্রবণ মাত্র একটি বিশেষ কাব্যবৈশিষ্ট্য আমাদের মনে ভাসিয়া উঠে; একটি সংস্কার অন্তরে সক্রিয় হইয়া উঠে। ইহারা শুধুমাত্র তাহাদের ছন্দ-প্রকরণেই অন্যতর, তাহাই নহে- ইহাদের বক্তব্যের মধ্যেও একটি স্বাতন্ত্র্য আছে। এই শ্রেণীর কবিতায় উদ্ভট বিষয়, অবাস্তব পরিস্থিতি, বক্তব্যের অসম্পূর্ণতা, চিত্রের অসমীচীনতা বর্তমান থাকে। ইহাতে একটি বিশেষ বিষয় কখনও পরিপাটিভাবে শেষের দিকে অগ্রসর হয় না। কিন্তু শিশু-কবিতার ছন্দ সাধারণত পয়ার আশ্রয়ী। অধিকন্তু তাহাতে অসম্ভব বিষয়ের বর্ণনা থাকিলেও কখন উদ্ভট অসামঞ্জস্য দেখা যায় না। একটা সুষ্ঠু পরিণতি সেখানে সম্ভাব্য।...’
--[ আশুতোষ ভট্টাচার্য। ‘বাংলার লোক-সাহিত্য’, ২য় খণ্ড। ক্যালকাটা বুক হাউস। ১৩৬৯। ]


‘...প্রচলিত ছড়ার চিত্রগুলো খাপছাড়া হলেও একটি বিশেষ রীতি অনুসরণ করেই তাদের চিত্রগুলো পরিকল্পিত হয়। বিশেষত সে সকল পরিকল্পনা যে সচেতন মনের প্রয়াস, তা কিছুতেই বুঝতে পারা যায় না।...
...প্রচলিত লেখার ছড়াগুলোর মধ্যে যে সকল চিত্র থাকে, তা শিশুর জ্ঞান এবং বিশ্বাস অনুযায়ী সত্য; তা কখনও সচেতনভাবে উদ্ভট করে রচিত হয় না।...
...ছড়া কবিতার মতো দীর্ঘ না হওয়াই নিয়ম;...
...ছড়ার ছন্দ প্রাকৃত বাংলা শব্দ দ্বারা গঠিত; প্রাকৃত বাংলারও যে একটা সাধুরূপ আছে, ছড়ায় তা ব্যবহার করা হয় না, বরং তার পরিবর্তে নিতান্ত গ্রাম্য এবং আঞ্চলিক শব্দ দ্বারাই তা গঠিত হয়।...
...বাংলা ছড়ার কতকগুলো সাধারণ শব্দ সম্পদ আছে,...’
--[আশুতোষ ভট্টাচার্য। ‘রবীন্দ্রনাথ ও লোক-সাহিত্য’। এ.মুখার্জী অ্যান্ড কোম্পানী প্রাঃ লিঃ,কলকাতা। অগ্রহায়ণ ১৩৮০।]


উপরোক্ত মতামতগুলোকে জারিত করে বাংলা ছড়ার মোটামুটি কিছু বৈশিষ্ট্য আমরা এবার হয়তো চিহ্ণিত করে নিতে পারি। এ ক্ষেত্রে এই মতামতগুলোর অনুসরণে গবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ ছড়ার যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে সংক্ষেপে উপস্থাপন করেন, তা হলো:
১. ছড়ায় যুক্তিসঙ্গত বা বিশিষ্ট ভাব কিংবা ভাবের পারম্পর্য নেই।
২. ছড়ায় ঘটনার ধারাবাহিকতা বা আনুপূর্বিক কাহিনী থাকে না।
৩. ছড়া ধ্বনি প্রধান, সুরাশ্রয়ী।
৪. ছড়ায় রস ও চিত্র আছে, তত্ত্ব ও উপদেশ নেই।
৫. ছড়ার ছন্দ শ্বাসাঘাত প্রধান প্রাকৃত বাংলা ছন্দ।
৬. ছড়া বাহুল্যবর্জিত, দৃঢ়বদ্ধ ও সংক্ষিপ্ত।
৭. ছড়ার ভাষা লঘু ও চপল।
৮. ছড়ার রস তীব্র ও গাঢ় নয়, স্নিগ্ধ ও সরস।


আলোচিত মতামতগুলোর ভিত্তিতে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়। যেমন:
ক) ছড়া ও সঙ্গীতের পার্থক্য:
১. ছড়া আবৃত্তি বা ধ্বনিনির্ভর। অন্যদিকে সঙ্গীত তাল ও সুর নির্ভর।
২. ছড়ার সুর একটানা বৈচিত্র্যহীন। অন্যদিকে সঙ্গীতের সুর বিচিত্র বা বৈচিত্র্যময়।

খ) ছড়া ও শিশু-কবিতার পার্থক্য:
১. ছড়ার বিষয়বস্তু উদ্ভট, অসঙ্গত। শিশু-কবিতার বিষয়বস্তু সাধারণত সুসঙ্গত হয়ে থাকে।
২. ছড়ার আকার হ্রস্ব। শিশু-কবিতার আকার দীর্ঘও হয়ে থাকে।
৩. ছড়ার ছন্দ শ্বাসাঘাত প্রধান প্রাকৃত বাংলা ছন্দ অর্থাৎ স্বরবৃত্ত। কিন্তু শিশু-কবিতার যে কোন ছন্দ হতে পারে।
৪. ছড়ার পরিণতি আকস্মিক। অন্যদিকে শিশু-কবিতার পরিণতি সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত।


হাজার বছরের পথপরিক্রমায় ছড়ার যে ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার বহন করছি আমরা, তাকে অক্ষত ও সুশৃঙ্খল রাখার প্রত্যয়ে আমরা আসলেই কি সৎ ও আন্তরিক কিনা তা এখনো স্পষ্ট হয়ে উঠেনি। তাহলে হয়তো আমাদের জন্য মানুষের ছদ্ম-পরিচয়ধারী গরিলার মতোই ছড়ার নামে অছড়ার উৎপাত নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই বাংলা ছড়ার নির্ধারণসূত্রটাকে সুষ্ঠুভাবে ধারণ করা সম্ভব হতো। সেক্ষেত্রে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোকে যদি আমরা ক্লাসিক ছড়ার শর্ত হিসেবে জুরি বানিয়ে নিই তাতে বাংলা ছড়ার কোন ক্ষতি বৃদ্ধি ঘটবে কিনা বা প্রয়োজনীয় আইডেণ্টিটি তৈরি হবে কিনা, তা হয়তো ভাবনার সময় হয়েছে এখন। কিন্তু আধুনিক ছড়া লিখিয়েরা যে কষ্টিপাথরে যাচাই করেই নিজেদেরকে শোধরে নেয়ার সুযোগটুকু পেতে পারেন, সেই পাথরটাকেই আরেকটু নিখাদ করে নেয়া যায় কিনা তা-ও আগে যাচাই করে নিতে হবে বৈ কি। কেননা লোকছড়া ভিত্তিক যে পর্যালোচনাগুলো বিশ্লেষণ করে ছড়ার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণী শর্তগুলো সমন্বিত করার প্রয়াস দেখতে পাই আমরা, তাতে আধুনিক ছড়ার বৈশিষ্ট্যকে কতোটা ধারণ করা গেছে তা প্রশ্নের উর্ধ্বে এখনো অবস্থান নিতে পারে নি বলেই ধারণা। যা ছড়া হয়নি, তা হয়তো কবিতা বা পদ্য হবে। ওগুলোও সাহিত্যের এক একটা মাধ্যম। কিন্তু ছড়াকে ছড়া হয়ে উঠতে বা ছড়াকে ছড়ার মতো থাকতে দিতে আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়। অথচ একালে এসে খুবই দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা নিয়ে কাউকে খুব একটা আলোকপাত করতে এখনো দেখছি না আমরা। এটা কি আমাদের অক্ষমতা না কি আমাদের সৃজনক্ষমতাহীন সুবিধাবাদ জিন্দাবাদ, তাও ব্যবচ্ছেদ করে নেয়াটা জরুরি বৈ কি। নইলে শুধু শুধু ছড়ার চরিত্র হননই ঘটতে থাকবে, সাহিত্যের আদৌ কোন উপকার হবে কিনা সন্দেহ।
দিগম্বর কী, তাই না জানলাম যদি, আমাদের বোধশূন্যহীন দিগম্বর অবস্থার ছড়াছড়ির অবসান ঘটবে কি কখনো ?

কৃতজ্ঞতা:
০১) ছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি/ সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ/ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পৌষ ১৩৯৫, ঢাকা।
০২) বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা/ ওয়াকিল আহমদ/ বইপত্র, এপ্রিল ২০০৭, ঢাকা।
০৩) কাব্যতত্ত্ব - অন্বেষা/ নরেন বিশ্বাস/ অনন্যা, আগস্ট ২০০২, ঢাকা।
০৪) নির্বাচিত প্রবন্ধ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ সম্পাঃ রবিশংকর মৈত্রী/ শুভ প্রকাশন, বইমেলা ২০০৫, ঢাকা।
০৫) খুকুমণির ছড়া/ যোগীন্দ্রনাথ সরকার/ ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, বইমেলা ২০০৬, কলকাতা।
০৬) অন্নদাশঙ্কর রায়ের শ্রেষ্ঠ ছড়া/ সম্পাঃ দাউদ হায়দার/ চারদিক, মার্চ ২০০৪, ঢাকা।
০৭) শিশু কিশোর কবিতার হাজার বছর/ সম্পাঃ কামরুন নাহার শিমুল ও কাজী ইমদাদ/ অনিকেত, ফেব্র“য়ারি ২০০৭, ঢাকা।

[muktangon-nirmaan]